
✍️ মো. আতাউর রহমান
গণিতের সবচেয়ে বড় দর্শনটি হয়তো সংখ্যার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। শূন্যের কোনো নিজস্ব মূল্য নেই, অথচ একটি সংখ্যার পাশে বসেই সেই শূন্য তাকে দশ, একশ কিংবা হাজারে রূপান্তরিত করে। মানুষের জীবনও যেন ঠিক তেমনি। আমরা সবাই শূন্য থেকেই যাত্রা শুরু করি, কিন্তু সবাই দশে পৌঁছাতে পারি না। কারণ, দশ হওয়ার জন্য শুধু সময়ের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন চরিত্র, প্রজ্ঞা, বিনয় এবং মানুষের প্রতি দায়বোধের।
জন্মের সময় মানুষের হাতে থাকে না কোনো পদ, ক্ষমতা কিংবা পরিচয়ের অহংকার। সে একেবারেই শূন্য। কিন্তু প্রকৃতি তাকে সম্ভাবনার অসীম দুয়ার খুলে দেয়। শিক্ষা তাকে একটি সংখ্যা দেয়, শ্রম তাকে আরেকটি সংখ্যা দেয়, সততা তাকে আরও একটি সংখ্যা দেয়, আর মানুষের ভালোবাসা তাকে দশে রূপান্তরিত করে। সুতরাং, দশ হওয়ার পেছনে কেবল ব্যক্তির অবদান থাকে না; সেখানে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সময়েরও একটি নীরব ভূমিকা থাকে।
আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এই যে, মানুষ দশ হতে চায়, কিন্তু শূন্য থাকার বিনয়টুকু ধারণ করতে চায় না। রাজনীতিতে আমরা ক্ষমতার দশ দেখতে পাই, কিন্তু সেবার শূন্য দেখি না। অর্থনীতিতে সম্পদের দশ দেখি, কিন্তু ন্যায়বণ্টনের শূন্য দেখি না। সমাজে খ্যাতির দশ দেখি, কিন্তু মানবিকতার শূন্যটি ক্রমশ অনুপস্থিত হয়ে যাচ্ছে।
একজন মানুষ যখন রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছান, তখন তার মনে রাখা উচিত—একদিন তিনিও ছিলেন শূন্য। একজন শিল্পপতির মনে রাখা উচিত—তার প্রতিষ্ঠানের দশের পেছনে হাজারো শ্রমিকের শূন্য লুকিয়ে আছে। একজন শিক্ষকের মনে রাখা উচিত—তার জ্ঞানের দশের পেছনে রয়েছে তাঁর শিক্ষকদের অবদান। একজন রাজনীতিকের মনে রাখা উচিত—জনগণের ভোটের শূন্য ছাড়া তাঁর ক্ষমতার দশ কোনোদিন পূর্ণতা পায় না।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে দশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শূন্যকে অস্বীকার করার এক অসুস্থ সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। একজন জনপ্রতিনিধি জনগণকে ভুলে যান, একজন আমলা রাষ্ট্রকে ভুলে যান, একজন ধনী মানুষ সমাজকে ভুলে যান, আর একজন জ্ঞানী মানুষ বিনয়কে ভুলে যান। ফলে দশের অহংকার তাকে গ্রাস করে। অথচ গণিত আমাদের শেখায়, দশ থেকে শূন্যকে বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, তা কেবল এক। আর সেই একও যদি তার নৈতিকতা হারায়, তবে তার মূল্য শূন্যেরও নিচে নেমে যায়।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এই দর্শন প্রযোজ্য। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি দুই অঙ্কের ঘর স্পর্শ করে, কিন্তু সেখানে মানুষের ন্যায়বিচার, শিক্ষার সমতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অনুপস্থিত থাকে, তবে সেই দশ আসলে একটি অলঙ্কার মাত্র। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন জিডিপির সংখ্যায় নয়, মানুষের মুখের হাসিতে পরিমাপ করা উচিত। কারণ, সংখ্যার উন্নয়ন সব সময় মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করে না।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন সংখ্যার মোহ আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। রাজনীতি সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব কষছে, অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির সংখ্যা গুনছে, শিক্ষা জিপিএর সংখ্যা দেখছে, সমাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীর সংখ্যা গুনছে। কিন্তু মানুষ ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে তার ভেতরের শূন্যটিকে—যে শূন্য তাকে বিনয়ী হতে শেখায়, অন্যের পাশে দাঁড়াতে শেখায় এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করতে শেখায়।
প্রকৃতির কাছ থেকেও আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। একটি বীজ প্রথমে শূন্যের মতোই ক্ষুদ্র ও নীরব। কিন্তু সময়, পরিচর্যা ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই সে মহীরুহে পরিণত হয়। নদীও ক্ষুদ্র জলধারা থেকে সাগরে পৌঁছায়। মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু মহীরুহ কখনো তার বীজকে অস্বীকার করে না, সাগর কখনো তার উৎসকে ভুলে যায় না। ভুলে যায় কেবল মানুষ।
সবচেয়ে বড় সত্যটি সম্ভবত এখানেই যে, জীবন শুরু হয় শূন্য দিয়ে এবং শেষও হয় শূন্যেই। মাঝখানের সময়টুকু কেবল দশ হওয়ার সাধনা। প্রশ্ন হলো, আমরা কোন দশ হতে চাই? ক্ষমতার দশ, নাকি মানবতার দশ? সম্পদের দশ, নাকি সততার দশ? নাকি এমন একটি দশ, যার পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ আশ্রয় ও আস্থা খুঁজে পায়?
আমাদের ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন এবং রাষ্ট্রজীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত—দশ হও, কিন্তু তোমার শূন্যকে ভুলে যেয়ো না। কারণ, শূন্যকে ভুলে যাওয়া মানেই নিজের শেকড়কে অস্বীকার করা। আর যে জাতি তার শেকড়কে ভুলে যায়, তার দশও একদিন আবার শূন্যে ফিরে আসে।
জীবনের শ্রেষ্ঠ গণিত তাই এটি নয় যে, তুমি কত বড় সংখ্যা হলে; বরং এটি যে, তুমি দশ হওয়ার পরও কতটা শূন্য থাকতে পারলে। কেননা, শূন্য বিনয় শেখায়, এক সংগ্রাম শেখায়, আর দশ শেখায়—পূর্ণতা কখনো একার অর্জন নয়।