
নিজস্ব প্রতিবেদক | পঞ্চখণ্ড আই :
২০২৪ সালের ৫ জুন উচ্চ আদালতের এক রায়ের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা বহাল থাকার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। প্রথমে কোটাব্যবস্থার সংস্কার ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন দ্রুতই রূপ নেয় বৃহত্তর গণআন্দোলনে। গুম, খুন, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ যুক্ত হয়ে আন্দোলন একপর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
দুই বছর পর সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের অর্জন, অপূর্ণতা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় মুখর রাজনৈতিক অঙ্গন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসনের অবসান এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের তুলনামূলক স্বাধীনতা, গুমের অভিযোগ হ্রাস এবং ভোটাধিকার চর্চার পরিবেশকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে একই সঙ্গে সামনে এসেছে নানা হতাশার চিত্রও। বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত সংস্কার হয়নি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগও রয়ে গেছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের অনেক অঙ্গীকার এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে বিভিন্ন মহল অভিযোগ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদুর রহমান মান্নার ভাষায়, সরকার পতন ছিল জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সফলতা। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনও অসম্পূর্ণ। অন্যদিকে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজের মতে, দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান হলেও নতুন করে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও মব সংস্কৃতির উত্থান উদ্বেগের কারণ।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল কাইয়ূম মনে করেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংলাপ, রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য এবং তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য অর্জন। তবে খেলাফত মজলিস, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনের ঘোষিত সংস্কার ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
সরকারপক্ষ অবশ্য দাবি করছে, অল্প সময়ের মধ্যেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রাণবন্ত সংসদ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। তাদের মতে, বাকি সংস্কারগুলোও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।
দুই বছর পর এসে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জুলাই আন্দোলন কি শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতেও স্থায়ী পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে দেশবাসী। বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর।