Eng
উপসম্পাদকীয়

আইফোন, পাঁচ হাজার টাকা ও বয়সের ব্যবধানের বন্ধুত্ব: অপ্রতিমের মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেল | ✍️ আতাউর রহমান

প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ



একটি আইফোন। পাঁচ হাজার টাকা। কয়েকটি মুঠোফোন বার্তা। টিকটক ভিডিও করার প্রলোভন। আর বয়সে বড় কয়েকজনের সঙ্গে এক কিশোরের ঘনিষ্ঠতা—এই বিচ্ছিন্ন সূত্রগুলোই শেষ পর্যন্ত কুমিল্লার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যুর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যুকে শুধু একটি অপরাধের তদন্ত হিসেবে দেখলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে।

কারণ একটি কিশোর কীভাবে পরিবারের অগোচরে এমন একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে? কেন একটি দামি মোবাইল তাকে নিরাপদ ঘর থেকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যেতে পারে? কেন সে বিপদের আশঙ্কা করেও বিষয়টি আগে পরিবারকে জানায়নি? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি আমাদের সন্তানদের সঙ্গে এতটাই দূরে সরে গেছি যে তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও গোপন সংকেতগুলো আমাদের অজানাই থেকে যাচ্ছে?

তদন্তাধীন কোনো বিষয়কে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। পুলিশও ঘটনার বিভিন্ন দিক যাচাই করছে। কিন্তু তদন্তে উঠে আসা তথ্যগুলো ইতোমধ্যে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে কিছু গভীর প্রশ্ন রেখে গেছে।

সন্তানের হাতে স্মার্টফোন ও নিরাপত্তা

আজকের কিশোরদের জীবন থেকে স্মার্টফোন আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। শিক্ষা, বিনোদন, বন্ধুত্ব, ছবি, ভিডিও—সবকিছুই এখন একটি পর্দার মধ্যে। কিন্তু এই পর্দার আড়ালেই তৈরি হতে পারে এমন কিছু সম্পর্ক, যার খবর অনেক সময় পরিবার জানতে পারে অনেক দেরিতে।

অপ্রতিমের ক্ষেত্রে দামি আইফোন ব্যবহার করে ভিডিও ও ছবি তোলার কথা বলা হয়েছিল বলে তদন্তে এসেছে। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কিশোর বয়সে প্রযুক্তি শুধু প্রয়োজনের বস্তু নয়; এটি অনেক সময় সামাজিক পরিচয় ও বন্ধুত্বেরও অংশ হয়ে ওঠে।

তাই সন্তানের হাতে ফোন তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে শেখাতে হবে—কারও কথায় একা কোথাও যাওয়া যাবে না, অপরিচিত বা বয়সে অনেক বড় কারও সঙ্গে নির্জন স্থানে দেখা করা নিরাপদ নয়, দামি কোনো উপহারের বিনিময়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় এবং বিপদের সামান্য আভাস পেলেও সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের কাউকে জানাতে হবে।

বন্ধুত্বের স্বাধীনতা, কিন্তু নিরাপত্তার সীমারেখা

কৈশোরে বন্ধুত্ব স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু বয়স ও অভিজ্ঞতার বড় পার্থক্য থাকলে সম্পর্কের ভেতর ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একজন কিশোর হয়তো যাকে নিছক বন্ধু মনে করছে, অপর পক্ষ সেই সম্পর্ককে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে।

অপ্রতিমের ঘটনায় বয়সে বড় কয়েকজনের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টি তদন্তে এসেছে। এ তথ্যের প্রকৃত তাৎপর্য তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। তবে ঘটনাটি অভিভাবকদের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা বহন করে—সন্তানের বন্ধুত্বকে অন্ধভাবে সন্দেহ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি তার সামাজিক পরিসর সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকাও নিরাপদ নয়।

সন্তান কার সঙ্গে মেশে, কোথায় যায়, কার সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করে—এসব জানার অর্থ গোয়েন্দাগিরি করা নয়। এটি দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বের অংশ।

শাসনের চেয়ে আস্থার শক্তি বেশি

আমাদের অনেক পরিবারে সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের প্রধান ভাষা এখনও শাসন। ‘কোথায় গিয়েছিলে?’ ‘কার সঙ্গে ছিলে?’ ‘এতক্ষণ বাইরে কেন?’—এসব প্রশ্নের প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রশ্নের পাশাপাশি প্রয়োজন এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে সন্তান ভয় না পেয়ে সত্য কথা বলতে পারে।

যে সন্তান মনে করে কোনো সমস্যার কথা বললে প্রথমেই তাকে বকা হবে, ফোন কেড়ে নেওয়া হবে বা অপমান করা হবে, সে বিপদের কথাও গোপন করতে পারে।

তাই অভিভাবকদের দায়িত্ব শুধু সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; তার বিশ্বাস অর্জন করা। প্রতিদিন কিছু সময় তার কথা শোনা, তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানা, তার অনলাইন আচরণ সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন এলে কারণ বোঝার চেষ্টা করা—এসব ছোট ছোট উদ্যোগ বড় বিপদ প্রতিরোধ করতে পারে।

সমাজ কি শুধু দর্শক থাকবে?

একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু বাবা-মায়ের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাড়া-প্রতিবেশী, সামাজিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—সবাই মিলে শিশুর নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করে।

তবে সামাজিক নজরদারি যেন গুজব, অপমান বা বিচারবহির্ভূত অভিযোগে পরিণত না হয়। কোনো কিশোর কারও সঙ্গে মিশছে—এটুকু তথ্য দিয়ে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া সমাধান নয়। প্রয়োজন দায়িত্বশীলভাবে তথ্য যাচাই করা এবং ঝুঁকি মনে হলে পরিবার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধের পর নয়

কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, ডিজিটাল যোগাযোগের আইনসম্মত বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ—এসব তদন্তের অংশ। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও আগে শুরু হওয়া প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ে শিশু সুরক্ষা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম, নিখোঁজ শিশু শনাক্তে দ্রুত সমন্বয় এবং শিশুদের জন্য সহজলভ্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

শিশুকে শুধু অপরাধ থেকে রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; তাকে এমন দক্ষতাও দিতে হবে, যাতে সে নিজেই বিপদের সংকেত চিনতে পারে এবং সাহায্য চাইতে পারে।

আইফোনের চেয়েও বড় যে শিক্ষা

একটি আইফোন কিংবা পাঁচ হাজার টাকা হয়তো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বস্তুতে নয়। শিক্ষা হলো—একজন কিশোরের আবেগ, কৌতূহল, বন্ধুত্ব, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সামাজিক সম্পর্ককে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

শিশুকে শুধু ‘লোভ করো না’ বললে হবে না। তাকে শেখাতে হবে—প্রলোভন কীভাবে কাজ করে, চাপের মুখে কীভাবে ‘না’ বলতে হয়, অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসতে হয় এবং বিপদের মুহূর্তে কার কাছে সাহায্য চাইতে হয়।

একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, নিরাপত্তার নামে সন্তানকে এমনভাবে আবদ্ধ করাও সমাধান নয়, যাতে সে নিজের কথা বলার মানুষই না পায়।

অপ্রতিমের মৃত্যু যেন আমাদের শেষ সতর্কবার্তা হয়

অপ্রতিম আর কোনো দিন স্কুলের পোশাক পরে শ্রেণিকক্ষে ফিরবে না। মায়ের ফোন নিয়ে আর কোনো ভিডিও করতে বের হবে না। তার বাবা-মায়ের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, কোনো বিচার, কোনো ক্ষতিপূরণ, কোনো সামাজিক উদ্যোগ তা পূরণ করতে পারবে না।

কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যু যদি শুধু কয়েক দিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভ হয়ে থেকে যায়, তাহলে আমরা তার কাছ থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটিই হারাব।

এখন প্রয়োজন শোককে সচেতনতায়, ক্ষোভকে প্রতিরোধে এবং একটি পরিবারের কান্নাকে সামাজিক দায়িত্বে রূপান্তর করা।

প্রতিটি পরিবারকে সন্তানের বন্ধু হতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তার আশ্রয় হতে হবে। সমাজকে হতে হবে সতর্ক, কিন্তু দায়িত্বশীল। আর রাষ্ট্রকে অপরাধ ঘটার পর শুধু প্রতিক্রিয়া দেখালে চলবে না—ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

কারণ একটি শিশুকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব কোনো একক পরিবারের নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব।

অপ্রতিমের জন্য আমাদের সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধা হবে আরেকটি মোমবাতি জ্বালানো নয়—বরং এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে আর কোনো কিশোর একটি ফোন, একটি বন্ধুত্ব কিংবা একটি প্রলোভনের কারণে নিজের নিরাপদ পৃথিবী থেকে অজানা বিপদের দিকে পা বাড়িয়ে না দেয়।