-লেখক : আতাউর রহমান
একটি জাতির দুর্ভাগ্য তখনই শুরু হয়, যখন রাষ্ট্রের কোষাগারকে কেউ ব্যক্তিগত ভাণ্ডার মনে করে, আইনকে ক্ষমতার চাকরে পরিণত করে এবং জনগণের অধিকারকে কেনাবেচার পণ্যে রূপ দেয়। ঘুষ তখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্র পরিচালনার অলিখিত বিধি। দুর্নীতি তখন কেবল অর্থ আত্মসাতের নাম নয়; এটি ন্যায়বিচারের হত্যাকাণ্ড, বিবেকের অবক্ষয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক নির্মম বিশ্বাসঘাতকতা।
যে সমাজে সততা উপহাসের বিষয়, যোগ্যতা অবমূল্যায়িত এবং অসততা পুরস্কৃত হয়, সেখানে সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্য থাকলেও ভেতরে ভেতরে রাষ্ট্রের ভিত্তি ক্ষয়ে যেতে থাকে। দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এটি মানুষের প্রতিবাদের শক্তিকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়। মানুষ একসময় অন্যায়কে ভাগ্য বলে মেনে নেয়, অন্যায়কারীকেই শক্তিশালী মনে করে এবং নিজের নীরবতাকেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভেবে বসে। অথচ ইতিহাসে নীরব মানুষের নিরাপত্তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
ঘুষখোর ও লুটেরারা কেবল অর্থ লুট করে না; তারা মানুষের আস্থা লুট করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নষ্ট করে এবং সমাজে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তোলে, যেখানে সৎ মানুষ নিজেকে অযোগ্য মনে করতে শুরু করে। এর চেয়ে বড় জাতীয় বিপর্যয় আর কী হতে পারে?
তাই প্রশ্ন কেবল শাসকের নয়; প্রশ্ন নাগরিকেরও। আমরা কি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করব, নাকি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াব? আমরা কি সুবিধার বিনিময়ে বিবেক বিকিয়ে দেব, নাকি সাময়িক কষ্ট মেনে হলেও নীতিকে আঁকড়ে ধরব?
একজন নাগরিকের প্রথম দায়িত্ব হলো—নিজেকে দুর্নীতির অংশীদার না করা। ঘুষ দিয়ে নিজের কাজ উদ্ধার করা যত সহজই মনে হোক, তা শেষ পর্যন্ত অন্যায়ের শিকড়কে আরও গভীর করে। দ্বিতীয় দায়িত্ব—সত্যকে উচ্চারণ করা। ভয়, লোভ কিংবা দলীয় আনুগত্য যদি সত্যকে বন্দি করে ফেলে, তবে রাষ্ট্রের স্বাধীনতাও কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সংগঠন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান—সবাইকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আদালত বা তদন্ত সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতির আত্মরক্ষার সংগ্রাম।
সবচেয়ে বড় কথা, ক্ষমতা কখনোই জনগণের ওপরে নয়; ক্ষমতা জনগণের অর্পিত আমানত। যে শাসক এই সত্য ভুলে যায়, সে রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। আর যে নাগরিক এই সত্য ভুলে যায়, সে নিজের অধিকার হারায়।
আজ প্রয়োজন প্রতিহিংসা নয়, জবাবদিহি; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার; ব্যক্তির আনুগত্য নয়, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা; ক্ষমতার দম্ভ নয়, সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা। রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন আইন দুর্বলকে যেমন রক্ষা করে, তেমনি ক্ষমতাবানকেও জবাবদিহির আওতায় আনে।
মনে রাখতে হবে, দুর্নীতির সাম্রাজ্য কখনো জনগণের শক্তির চেয়ে বড় নয়। ইতিহাসে কোনো লুটেরার রাজত্ব স্থায়ী হয়নি; স্থায়ী হয়েছে মানুষের ন্যায়বোধ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং সত্যের শক্তি। তাই নাগরিকের নীরবতা নয়, জাগ্রত বিবেকই হোক পরিবর্তনের সূচনা।
যে দিন সাধারণ মানুষ অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া বন্ধ করবে, যে দিন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি নয়, আইনের কাছে দায়বদ্ধ হবে, যে দিন সততা আবার সম্মানের প্রতীক হবে—সে দিনই একটি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র সুশাসনের পথে ফিরতে শুরু করবে। আর সেই পথচলার প্রথম পদক্ষেপটি নিতে হবে নাগরিককেই।