
লেখক— শমশের আলম
জীবনের সবচেয়ে প্রাচীন ও অনিবার্য সঙ্গীদের মধ্যে একটি শব্দ হলো—অভাব। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ কোনো না কোনো অভাবের সঙ্গে বসবাস করে। কারও অর্থের অভাব, কারও অন্নের, কারও কর্মসংস্থানের, কারও ভালোবাসার, আবার কারও মানসিক শান্তির। জীবনের পথচলায় বহু প্রাপ্তি আসে, অনেক অপূর্ণতাও পূরণ হয়; কিন্তু একটি বিষয় যেন কখনোই বিদায় নেয় না—অভাব।
অনেকেই বলেন, সময় বদলালে অভাব কেটে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন কথা বলে। একটি সংকটের অবসান ঘটতে না ঘটতেই আরেকটি নতুন সংকট এসে দাঁড়ায়। তখন উপলব্ধি হয়—পৃথিবীতে হয়তো অনেক কিছুরই অভাব হতে পারে, কিন্তু অভাবের কোনো অভাব নেই।
বাক্যটি আপাতদৃষ্টিতে শব্দের খেলা মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর সামাজিক ও মানবিক বাস্তবতা। সমাজে নিত্যপণ্যের সংকট দেখা দেয়, হাসপাতালের শয্যা কম পড়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়, ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা অপূর্ণ থাকে; আবার মানুষের ভেতরেও ক্রমশ কমে আসে সহমর্মিতা, সততা ও মানবিকতা। অর্থাৎ সংকটের রূপ বদলায়, কিন্তু সংকটের অস্তিত্ব থেকে যায়।
বিশেষ করে মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন যেন এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বেতন বাড়লেও বাড়ে বাজারদর। আয় বাড়লেও বেড়ে যায় ব্যয়। সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ—সব মিলিয়ে মাস শেষে হিসাবের খাতা আবারও লাল হয়ে ওঠে। তখন অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলতে হয়—সংসারে অনেক কিছুরই অভাব, তবে অভাবের কোনো অভাব নেই।
একই চিত্র দেখা যায় তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের জীবনেও। দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটি চাকরি মিললেও শেষ হয় না সংগ্রাম। অপ্রতুল বেতন, কর্মক্ষেত্রের চাপ, অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ নতুন এক অভাবের জন্ম দেয়। অর্থাৎ অভাবের চেহারা পাল্টায়, কিন্তু তার উপস্থিতি অটুট থাকে।
রাষ্ট্রীয় বাস্তবতাও এর বাইরে নয়। উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা বড় বড় প্রকল্প মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা তৈরি করে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরেকটি নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফলে উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিক ভোগান্তিও বহাল থাকে। এতে মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—মানুষের চাহিদার শেষ নেই, আর সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়েই অভাবেরও যেন শেষ নেই। তাই অভাবকে কেবল অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি মানুষের অস্তিত্ব, প্রত্যাশা ও সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে নির্মম সত্যটি হলো—অভাব বিদায় নেয় না, মানুষই বিদায় নেয়। মানুষ সারাজীবন অভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করে, কিছু অভাব পূরণ করে, আবার নতুন অভাবের মুখোমুখি হয়। একসময় মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়; কিন্তু তার অপূর্ণ স্বপ্ন, অসমাপ্ত চাওয়া আর অভাবের গল্প রয়ে যায় পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
তাই অভাবকে কেবল হতাশার প্রতীক হিসেবে না দেখে, জীবনকে আরও মানবিক ও সহমর্মিতাপূর্ণ করে তোলার প্রেরণা হিসেবেও দেখা প্রয়োজন। কারণ অভাব হয়তো কখনো সম্পূর্ণ শেষ হবে না, কিন্তু মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং মানবিক মূল্যবোধ সেই অভাবের তীব্রতা অনেকটাই লাঘব করতে পারে।
অভাবের জয়রথ হয়তো থামে না; কিন্তু মানুষের মানবিকতা যদি অটুট থাকে, তবে সেই অভাবের ভার অন্তত কিছুটা হলেও হালকা করা সম্ভব।