
মো. বিলাল উদ্দিন
পরিবর্তন মানবসমাজের একটি চিরন্তন বাস্তবতা। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা সভ্যতা—সবকিছুই পরিবর্তনের ধারায় বিকশিত হয়। তবে সব পরিবর্তন যে উন্নতির সমার্থক, তা নয়। কোনো পরিবর্তন মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যায়, আবার কোনো পরিবর্তন তাকে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। তাই পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করে তার ফলাফল ও গন্তব্যের ওপর।
আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি, যাকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিপ্লবের যুগ বলা হয়। মানুষের মেধা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে পৃথিবী আজ অভূতপূর্ব উন্নতির সাক্ষী। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেও বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, শক্তির আস্ফালন এবং নিরীহ মানুষের ওপর বর্বর আক্রমণ আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে মানবিকতার সংকট যেন দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
আমাদের দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের ভাষা যেখানে প্রধান হওয়ার কথা, সেখানে প্রায়শই শোনা যায় হুমকি, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার ঘোষণা এবং ক্ষমতার দম্ভপূর্ণ উচ্চারণ। রাজনৈতিক বক্তৃতা অনেক সময় যুক্তি ও আদর্শের পরিবর্তে প্রতিহিংসা ও বিভাজনের ভাষায় রূপ নেয়। এতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও জন্ম নেয় অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ।
দুঃখজনকভাবে, রাজনৈতিক অঙ্গনের এই অসহিষ্ণুতা অনেক সময় সমাজের নিচের স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র নেতৃত্বের মধ্যেও দেখা যায় দখলদার মনোভাব, আগ্রাসী আচরণ ও ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতা। ফলে পরিবর্তনের যে স্বপ্ন মানুষ দেখে, তা বাস্তবে রূপ না নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নতুন সংকটের জন্ম দেয়।
একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি হয় সহনশীল, নেতৃত্ব হয় দায়িত্বশীল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য থাকে জনগণের কল্যাণ। বক্তৃতা মানুষের চেতনা জাগাতে পারে, কিন্তু হুমকি কখনো উন্নয়নের পথ নির্মাণ করতে পারে না। ভয়ভীতি প্রদর্শন সাময়িকভাবে কাউকে নীরব করতে পারে, কিন্তু তা স্থায়ী শান্তি বা অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারে না।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। প্রয়োজন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা—পরিবর্তনের নামে আমরা কোথায় যাচ্ছি? যদি পরিবর্তনের ফল হয় আরও বিভক্তি, আরও ভয় এবং আরও অনিশ্চয়তা, তবে সেই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ও সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক। জাতির সামনে নতুন কোনো স্বপ্ন উপস্থাপন করতে হলে কেবল স্লোগান বা বক্তৃতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তব কর্মপরিকল্পনা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতি হুমকি, প্রতিহিংসা কিংবা ভয়ভীতির মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী উন্নতি অর্জন করতে পারেনি। উন্নতির ভিত্তি নির্মিত হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মতের ভিন্নতার প্রতি সহনশীলতা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর। তাই আজ সময়ের দাবি—বক্তৃতার উচ্ছ্বাস নয়, দায়িত্বশীল নেতৃত্বের চর্চা; হুমকির রাজনীতি নয়, আস্থার রাজনীতি।
জাতি পরিবর্তন চায়, তবে সেই পরিবর্তন হতে হবে কল্যাণের, মানবিকতার এবং অগ্রগতির। অন্যথায় বক্তৃতা আর হুমকির ঘোরপাকে ঘুরপাক খেতে খেতে আমরা হয়তো পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখব, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব না।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও সভাপতি, এডহক কমিটি- বাগিরঘাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।