ছিনতাইয়ের সংস্কৃতি: কোথায় থামবে এই প্রবণতা?

মো: বিলাল উদ্দিন:
ছিনতাই শব্দটি শুনলেই সাধারণত আমাদের চোখে ভেসে ওঠে রাস্তাঘাটে সংঘটিত অপরাধের দৃশ্য। কোনো ব্যক্তি বাসার ফটকে পৌঁছামাত্র কিংবা বাজার-শপিং শেষে ফেরার পথে দুর্বৃত্তের হাতে সর্বস্ব হারাচ্ছেন—এটাই ছিনতাইয়ের প্রচলিত চিত্র। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় ছিনতাই শুধু অর্থ, সম্পদ বা মোবাইল ফোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি যেন আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক গভীর সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
আজ ইতিহাস ছিনতাই হচ্ছে। প্রমাণিত সত্যকে মিথ্যার আবরণে ঢেকে নতুন করে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোকে বিকৃত করা হচ্ছে। যে কৃতিত্ব যার, তা অন্যের নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রগঠন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা উন্নয়নের মতো জাতীয় অর্জনগুলোও যেন দখল ও ছিনতাইয়ের প্রতিযোগিতার শিকার।
আরও উদ্বেগজনক হলো, সত্য ও ন্যায়ের জায়গাটিও ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। মিথ্যাকে বারবার উচ্চারণ করে সত্যে পরিণত করার অপচেষ্টা চলছে। ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে তৈরি করা হচ্ছে সাজানো গল্প ও কল্পিত বয়ান। ফলে সমাজে বিভ্রান্তি বাড়ছে, আস্থা কমছে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
রাজনীতির অঙ্গনেও এই প্রবণতা দৃশ্যমান। নেতৃত্বের যোগ্যতা, ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাসকে উপেক্ষা করে কৃত্রিমভাবে নেতৃত্ব নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে। কখনো স্বাধীনতার ঘোষণার কৃতিত্ব নিয়ে বিতর্ক, কখনো জাতীয় নেতাদের অবদান নিয়ে টানাপোড়েন, আবার কখনো উন্নয়নের মালিকানা নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা—এসবই মূলত ইতিহাস ও সত্যকে ছিনতাই করার প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ।
যে সমাজে সত্য ছিনতাই হয়, সেখানে ন্যায়বিচারও নিরাপদ থাকে না। যে রাষ্ট্রে ইতিহাস ছিনতাই হয়, সেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিক পথনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়। আর যেখানে নেতৃত্ব ও আদর্শ ছিনতাই হয়, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ছিনতাইয়ের এই বহুমাত্রিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের প্রথমেই সত্যকে সত্য হিসেবে স্বীকার করার সাহস অর্জন করতে হবে। ইতিহাসকে দলীয় চশমা দিয়ে নয়, তথ্য ও প্রমাণের আলোকে দেখতে হবে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ সম্পদ ছিনতাই হলে তা হয়তো পুনরুদ্ধার করা যায়, কিন্তু ইতিহাস, সত্য ও মূল্যবোধ ছিনতাই হলে তার ক্ষতি একটি জাতিকে দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হয়।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে সবকিছুই ছিনতাইয়ের কবলে পড়বে? নাকি সত্য, ন্যায় ও ইতিহাসকে তার প্রকৃত মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসব? সেই উত্তর খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।