রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
চারখাইয়ের আত্মসম্মান বনাম প্রশাসনিক বাস্তবতা—মডেল মসজিদের সিদ্ধান্ত হোক বিয়ানীবাজারের স্বার্থে সিলেটি ভাষাকে অপমান মানে:  বাংলাদেশের বহুত্বকেই অপমান আইন ও ন্যায়ের সংসদীয় অঙ্গনে এমরান আহমদ চৌধুরীর নতুন অধ্যায় বিয়ানীবাজারে জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মতবিনিময় সভা সম্পন্ন বিয়ানীবাজার মডেল মসজিদ বাস্তবায়নে অগ্রযাত্রা: আজ ইউএনও বরাবর ৬৫ শতক ভূমির প্রস্তাব পেশ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন হত্যায় গ্রেফতার ১ দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটি সভাপতি মনোনীত হলেন রোটারিয়ান মো. ফয়জুল ইসলাম বিয়ানীবাজার মডেল মসজিদ: এক সপ্তাহের মধ্যে স্থান নির্ধারণ হলে উপজেলা সদরেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের আশ্বাস: এমপি এমরান চৌধুরী UNB বেস্ট পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ডে মিলাদ মোহাম্মদ জয়নুল ইসলামকে অভিনন্দন

অবাধ্যতার মূল্য: নিরাপদ হোক সন্তানের ভবিষ্যৎ

  • প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
  • ৯৫ বার পড়া হয়েছে

আতাউর রহমান:

বিয়ানীবাজারের মফস্বলে এক কিশোরী কন্যার মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বিচারাধীন একটি ঘটনার চূড়ান্ত সত্য আদালতের রায়ের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ঘটনার বিচার করা নয়; বরং এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনার সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।

একটি শিশু জন্মের পর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়া উচিত তার পরিবার। বাবা-মা সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং প্রথম অভিভাবক। কিন্তু যখন পরিবারেই সংলাপের পরিবর্তে নীরবতা, বোঝাপড়ার পরিবর্তে সংঘাত এবং ভালোবাসার পরিবর্তে ক্ষোভ জায়গা করে নেয়, তখন সেই পরিবারই অজান্তে বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যায়।

কৈশোর মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই বয়সে আবেগ, কৌতূহল, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান প্রবল থাকে। ফলে বন্ধুত্ব, প্রেম কিংবা সম্পর্কের বিষয়ে অনেক সিদ্ধান্ত আবেগনির্ভর হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে চলবে না; বরং তা বুঝে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব।

অপ্রাপ্তবয়স্ক বয়সে প্রেম বা বিয়ে ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ—তিন ক্ষেত্রেই নানা জটিলতার জন্ম দিতে পারে। শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, মানসিক চাপ বাড়ে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং পারিবারিক দ্বন্দ্ব গভীর হতে পারে। তাই আইন যেমন বাল্যবিবাহ নিরুৎসাহিত করেছে, তেমনি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব কিশোর-কিশোরীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করে তোলা।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে—সন্তান ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুলের প্রতিকার কখনোই সহিংসতা হতে পারে না। একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও মমতা। কঠোর শাসন সাময়িক ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান দেয় না। যে সন্তান নিজের কথা বাবা-মায়ের কাছে নির্ভয়ে বলতে পারে, সে ভুল পথ থেকে ফিরে আসার সুযোগও বেশি পায়।

একই সঙ্গে সন্তানেরও দায়িত্ব রয়েছে। স্বাধীনতা মানেই সীমাহীন স্বাধীনতা নয়। পরিবার, শিক্ষা, আইন এবং সামাজিক মূল্যবোধকে অগ্রাহ্য করে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় নিজের জীবনকেই বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতাকে সব সময় বাধা হিসেবে নয়, বরং কল্যাণকামী সতর্কতা হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোর-কিশোরীদের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল সম্পর্ক অনেক সময় বাস্তব জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব জীবনের দায়িত্ব, শিক্ষা, পরিবার ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা উপেক্ষা করে কোনো সম্পর্কই টেকসই সুখ এনে দিতে পারে না। এ বিষয়ে পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় জীবনদক্ষতা, নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল সচেতনতার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মসজিদ, মন্দির, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমও পারিবারিক সম্প্রীতি ও দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব নিয়ে ইতিবাচক প্রচারণা চালাতে পারে।

আজ প্রয়োজন এমন একটি পারিবারিক সংস্কৃতি, যেখানে বাবা-মা সন্তানের কথা মন দিয়ে শুনবেন, আবার সন্তানও বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে সম্মান করবে। সম্পর্কের ভিত্তি হবে ভয় নয়, বিশ্বাস; শাসন নয়, সংলাপ; রাগ নয়, দায়িত্ববোধ।

একটি পরিবারের ভাঙন কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এর প্রভাব পুরো সমাজে পড়ে। তাই প্রতিটি পরিবারকে হতে হবে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র।

বিয়ানীবাজারের এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা হয়ে থাকুক। আমরা যেন প্রতিজ্ঞা করি—কোনো মতভেদ, কোনো আবেগ, কোনো সামাজিক চাপ কখনোই পরিবারকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারবে না।

পরিবারে সংলাপ ফিরুক, বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে বিশ্বাসের সেতুবন্ধন দৃঢ় হোক, নিরাপদ হোক প্রতিটি সন্তানের ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews