আতাউর রহমান:
বিয়ানীবাজারের মফস্বলে এক কিশোরী কন্যার মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বিচারাধীন একটি ঘটনার চূড়ান্ত সত্য আদালতের রায়ের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ঘটনার বিচার করা নয়; বরং এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনার সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।
একটি শিশু জন্মের পর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়া উচিত তার পরিবার। বাবা-মা সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং প্রথম অভিভাবক। কিন্তু যখন পরিবারেই সংলাপের পরিবর্তে নীরবতা, বোঝাপড়ার পরিবর্তে সংঘাত এবং ভালোবাসার পরিবর্তে ক্ষোভ জায়গা করে নেয়, তখন সেই পরিবারই অজান্তে বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যায়।
কৈশোর মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই বয়সে আবেগ, কৌতূহল, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান প্রবল থাকে। ফলে বন্ধুত্ব, প্রেম কিংবা সম্পর্কের বিষয়ে অনেক সিদ্ধান্ত আবেগনির্ভর হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে চলবে না; বরং তা বুঝে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব।
অপ্রাপ্তবয়স্ক বয়সে প্রেম বা বিয়ে ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ—তিন ক্ষেত্রেই নানা জটিলতার জন্ম দিতে পারে। শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, মানসিক চাপ বাড়ে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং পারিবারিক দ্বন্দ্ব গভীর হতে পারে। তাই আইন যেমন বাল্যবিবাহ নিরুৎসাহিত করেছে, তেমনি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব কিশোর-কিশোরীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করে তোলা।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে—সন্তান ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুলের প্রতিকার কখনোই সহিংসতা হতে পারে না। একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও মমতা। কঠোর শাসন সাময়িক ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান দেয় না। যে সন্তান নিজের কথা বাবা-মায়ের কাছে নির্ভয়ে বলতে পারে, সে ভুল পথ থেকে ফিরে আসার সুযোগও বেশি পায়।
একই সঙ্গে সন্তানেরও দায়িত্ব রয়েছে। স্বাধীনতা মানেই সীমাহীন স্বাধীনতা নয়। পরিবার, শিক্ষা, আইন এবং সামাজিক মূল্যবোধকে অগ্রাহ্য করে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় নিজের জীবনকেই বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতাকে সব সময় বাধা হিসেবে নয়, বরং কল্যাণকামী সতর্কতা হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোর-কিশোরীদের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল সম্পর্ক অনেক সময় বাস্তব জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব জীবনের দায়িত্ব, শিক্ষা, পরিবার ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা উপেক্ষা করে কোনো সম্পর্কই টেকসই সুখ এনে দিতে পারে না। এ বিষয়ে পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় জীবনদক্ষতা, নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল সচেতনতার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মসজিদ, মন্দির, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমও পারিবারিক সম্প্রীতি ও দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব নিয়ে ইতিবাচক প্রচারণা চালাতে পারে।
আজ প্রয়োজন এমন একটি পারিবারিক সংস্কৃতি, যেখানে বাবা-মা সন্তানের কথা মন দিয়ে শুনবেন, আবার সন্তানও বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে সম্মান করবে। সম্পর্কের ভিত্তি হবে ভয় নয়, বিশ্বাস; শাসন নয়, সংলাপ; রাগ নয়, দায়িত্ববোধ।
একটি পরিবারের ভাঙন কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এর প্রভাব পুরো সমাজে পড়ে। তাই প্রতিটি পরিবারকে হতে হবে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র।
বিয়ানীবাজারের এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা হয়ে থাকুক। আমরা যেন প্রতিজ্ঞা করি—কোনো মতভেদ, কোনো আবেগ, কোনো সামাজিক চাপ কখনোই পরিবারকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারবে না।
পরিবারে সংলাপ ফিরুক, বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে বিশ্বাসের সেতুবন্ধন দৃঢ় হোক, নিরাপদ হোক প্রতিটি সন্তানের ভবিষ্যৎ।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯