
✍️ আতাউর রহমান
বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ নিয়ে এখন নানা মহলে নানা কথা হচ্ছে। কেউ বলছেন উপজেলা সদরেই হওয়া উচিত, কেউ চারখাইয়ের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, আবার কেউ প্রশ্ন তুলছেন—এতদিন জায়গা পাওয়া গেল না কেন, এখন কোথায় নির্মাণ হবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে নানা বিশ্লেষণ, পাল্টা বক্তব্য ও আঞ্চলিক আবেগের প্রকাশ। এমনকি কোথাও কোথাও কথাবার্তা এমন পর্যায়ে যাচ্ছে, যা একটি ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এখানে প্রথমেই একটি কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার—মডেল মসজিদ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয় এবং কোনো ইউনিয়নের একক অধিকারও নয়। এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় বাস্তবায়নাধীন একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প। সুতরাং এর স্থান নির্ধারণের প্রশ্নটিও আবেগ, ব্যক্তিগত পছন্দ কিংবা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় নয়; সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত সরকারি নীতিমালা, প্রকল্পের অনুমোদিত কাঠামো, বাস্তবতা, জনস্বার্থ ও সর্বাধিক মানুষের সুবিধার ভিত্তিতে।
প্রথম দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের। নাগরিকরা প্রশ্ন তুলবেন, দাবি জানাবেন, স্মারকলিপি দেবেন—এটাই স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার। কিন্তু একটি সরকারি প্রকল্প কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে—তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নাগরিক বিতর্কের মাধ্যমে নয়, সরকারি বিধিবিধান ও যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হতে হবে।
তাই কর্তৃপক্ষের কাছে প্রথম প্রত্যাশা—বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা দূর করা।
যদি উপজেলা সদরের জন্য বরাদ্দকৃত প্রকল্প অন্যত্র নেওয়ার কোনো প্রস্তাব থাকে, তাহলে তার নীতিগত ও প্রশাসনিক ভিত্তি কী—তা স্পষ্ট করা হোক। আর যদি সদরেই বাস্তবায়নের সুযোগ থাকে, তাহলে জমি অনুসন্ধান, আন্তঃদপ্তর সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ দ্রুত সম্পন্ন করা হোক।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি কেন বাস্তবায়ন হয়নি, কোথায় বাধা রয়েছে এবং সেই বাধা কীভাবে দূর করা যায়—এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন।
নাগরিকদের দাবিও অযৌক্তিক নয়
অন্যদিকে উপজেলা সদরের সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি দেওয়া বা সদর এলাকায় মডেল মসজিদ নির্মাণের দাবি তোলা নিয়েও অযথা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোনো কারণ নেই।
নাগরিকরা তাদের যুক্তি দিয়েছেন—উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা এলাকা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র; প্রতিদিন বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে বিপুল মানুষ এখানে সরকারি সেবা নিতে আসেন; ফলে কেন্দ্রীয় স্থানে মডেল মসজিদ হলে এর সুবিধা বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
এই যুক্তিগুলো শুনতে হবে, যাচাই করতে হবে এবং সরকারি নীতিমালার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
তবে নাগরিক উদ্যোগেরও দায়িত্ব আছে। দাবি জানাতে গিয়ে কোনো ইউনিয়ন, কোনো ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠীকে হেয় করা উচিত নয়। সদর চাইতে গিয়ে চারখাইকে ছোট করা যেমন অনুচিত, তেমনি চারখাইয়ের সম্ভাব্যতাকে সামনে এনে সদরবাসীর যৌক্তিক প্রশ্নকে ‘আঞ্চলিকতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়াও সমানভাবে অনুচিত।
চারখাই বনাম সদর—এটি হওয়া উচিত নয়
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, একটি উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে যেন ‘সদর বনাম চারখাই’ ধরনের মানসিকতা তৈরি না হয়।
চারখাই বিয়ানীবাজার উপজেলারই অংশ। চারখাইয়ের মানুষ মডেল মসজিদ চাইলে সেটিও তাদের নাগরিক আকাঙ্ক্ষা। অন্যদিকে সদরবাসী উপজেলা সদরের জন্য বরাদ্দকৃত প্রকল্প সদরেই চাইলে সেটিও তাদের যুক্তিসঙ্গত দাবি।
দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যেই নাগরিক অধিকার আছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার জনগণের আবেগের নয়—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
অতএব, কে কোথায় জন্মেছেন, কোন এলাকার মানুষ, কার রাজনৈতিক পরিচয় কী—এসব দিয়ে মডেল মসজিদের স্থান নির্ধারণ করা যাবে না।
আঞ্চলিকতা নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন
একটি মডেল মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়। এর সঙ্গে ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, লাইব্রেরি, হিফজ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় কার্যক্রম যুক্ত থাকার কথা। ফলে জায়গা নির্বাচন করতে হলে শুধু জমি পাওয়া গেল কি না—এ প্রশ্ন যথেষ্ট নয়।
দেখতে হবে—
★কোথায় সবচেয়ে বেশি মানুষ সহজে আসতে পারবেন;
★যোগাযোগ ব্যবস্থা কেমন;
★জমির মালিকানা ও ব্যবহার কতটা নিরাপদ;
★ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ আছে কি না;
★প্রশাসনিক কেন্দ্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী;
★নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশ কতটা সহজ;
★প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হবে।
অর্থাৎ ‘জমি পাওয়া গেছে’—এটিই যেন একমাত্র মানদণ্ড না হয়; ‘জনগণের সর্বোচ্চ উপকার হবে কোথায়’—সেটিই হওয়া উচিত মূল প্রশ্ন।
বিতর্কের চেয়ে এখন দরকার সমাধান
বিয়ানীবাজারে মডেল মসজিদ প্রকল্প নিয়ে ইতোমধ্যে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। নাগরিক উদ্যোগ গঠিত হয়েছে, মতবিনিময় হয়েছে, স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন মহল থেকেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হচ্ছে।
এখন সময় এসেছে বিতর্কের পরবর্তী ধাপে যাওয়ার।
কর্তৃপক্ষের উচিত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য শুনে দ্রুত সম্ভাব্য স্থানগুলো সরেজমিনে যাচাই করা। প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, গণপূর্ত অধিদপ্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে নিয়ে একটি সমন্বিত বৈঠক করা যেতে পারে।
এরপর বাস্তব তথ্য ও সরকারি নীতিমালার আলোকে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
সেই সিদ্ধান্ত সদরপক্ষে গেলে চারখাইবাসীকে তা মেনে নিতে হবে। আবার যথাযথ সরকারি মূল্যায়নে অন্য কোনো স্থান অধিকতর উপযুক্ত প্রমাণিত হলে সদরবাসীকেও বৃহত্তর স্বার্থে তা বিবেচনা করতে হবে।
কারণ আমরা স্থান নিয়ে লড়াই করতে চাই না; আমরা চাই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হোক।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বিয়ানীবাজারের জন্য বরাদ্দকৃত মডেল মসজিদটি শেষ পর্যন্ত কোথায় হবে এবং কবে নির্মাণকাজ শুরু হবে? এই প্রশ্নের উত্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে নয়, চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।
যদি সদর এলাকায় উপযুক্ত জায়গা থাকে—তা দ্রুত নির্ধারণ করা হোক।
যদি না থাকে—কেন নেই, তা স্পষ্ট করা হোক।
যদি অন্যত্র নেওয়ার প্রয়োজন হয়—তার সরকারি ভিত্তি জানানো হোক।
আর যদি জমি ব্যবস্থাপনাই প্রধান বাধা হয়—তা দূর করার জন্য সময়সীমাবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়া হোক।
শেষ কথা
মডেল মসজিদকে কেন্দ্র করে বিয়ানীবাজারে যেন নতুন কোনো বিভাজনের রাজনীতি তৈরি না হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে আঞ্চলিক বিরোধের প্রতীকে পরিণত করা কারও জন্যই কল্যাণকর নয়।
সদরের মানুষ সদর চাইতেই পারেন, চারখাইয়ের মানুষ চারখাই চাইতেই পারেন—কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হবে বিয়ানীবাজারের বৃহত্তর স্বার্থে।
আমাদের সবার অবস্থান হওয়া উচিত এক জায়গায়—
“স্থান নিয়ে বিভাজন নয়, নীতিমালা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত চাই; সিদ্ধান্ত হলে দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।”
প্রশাসনের কাছে নাগরিকদের দাবি থাকবে—বিষয়টি ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিন।
আর নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান—দাবি থাকুক, মতভেদ থাকুক, যুক্তি থাকুক; কিন্তু বৈরিতা নয়।
কারণ একটি মডেল মসজিদ শুধু একটি ভবন নয়—এটি আগামী প্রজন্মের ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির একটি কেন্দ্র হতে পারে। তাই এর ভিত্তিপ্রস্তর যেন বিতর্কের ওপর নয়, ঐক্য, ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত ও জনস্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।