
–Π আতাউর রহমান
মানুষের সম্পদের যাকাত আছে, ক্ষমতারও জবাবদিহি আছে; কিন্তু জ্ঞানেরও যে একটি যাকাত রয়েছে, সে কথাটি আমরা ক’জন মনে রাখি?
“সবকিছুরই একটি যাকাত (শুদ্ধি) আছে, আর জ্ঞানের যাকাত হলো নির্বোধ ও মূর্খদের আচরণ বা কথা সহ্য করা”— হযরত আলী (রা.)-এর এই অনন্য বাণী কেবল একটি নৈতিক উপদেশ নয়, বরং ব্যক্তি ও সমাজ গঠনের এক গভীর জীবনদর্শন। এই একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে জ্ঞান, চরিত্র, বিনয় ও মানবিকতার পরিপূর্ণ শিক্ষা।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন জ্ঞানের চেয়ে জ্ঞানের প্রদর্শন অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোলাহল, রাজনৈতিক মেরুকরণ, পারিবারিক অসহিষ্ণুতা কিংবা সামাজিক বিদ্বেষ— সর্বত্র যেন যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের জয়জয়কার। মতের অমিলকে আমরা শত্রুতা মনে করি, ভিন্নমতকে দেখি ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে। জ্ঞান অর্জনের চেয়ে জ্ঞান ফলানোর প্রবণতাই যেন সমাজে অধিক দৃশ্যমান। অথচ প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে, অহংকারী নয়; সহনশীল করে, প্রতিহিংসাপরায়ণ নয়; নীরবতার সৌন্দর্য শেখায়, বাক্যের উগ্রতা নয়।
প্রকৃত জ্ঞানীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর কথায় নয়, তাঁর সহিষ্ণুতায়। তিনি জানেন, সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না, সব অপমানের প্রতিবাদ করতে হয় না এবং সব বিতর্কে বিজয়ী হওয়াও জরুরি নয়। কারণ কখন কথা বলতে হবে, তার চেয়ে বড় জ্ঞান হলো— কখন নীরব থাকতে হবে তা জানা। নীরবতা অনেক সময় পরাজয়ের নয়, প্রজ্ঞার ভাষা। যে নীরবতা আত্মসম্মান রক্ষা করে, যে নীরবতা সংঘাতের আগুন নিভিয়ে দেয়, যে নীরবতা মানুষকে আরও মহৎ করে তোলে— সেই নীরবতাই জ্ঞানের যাকাতের প্রথম কিস্তি।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, একজন মূর্খের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একজন জ্ঞানী মানুষকে তাঁর অবস্থান থেকে নামিয়ে আনা। মূর্খ কখনো যুক্তি দিয়ে জয়ী হতে চায় না; সে চায় আপনাকেও তার মতো করে তুলতে। সে আপনাকে ক্রোধে উত্তেজিত করতে চায়, আপনার ভাষাকে অশালীন করতে চায়, আপনার প্রজ্ঞাকে আবেগের কাছে পরাজিত করতে চায়। সেই ফাঁদে পা না দেওয়াই হলো জ্ঞানের শুদ্ধি। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁর জ্ঞানের পরিচয় দেন না তর্কে জিতে, বরং নিজের চরিত্রের উচ্চতায় অটল থেকে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, কিন্তু সহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটেনি। সনদের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মানবিকতার গভীরতা বাড়েনি। আমরা সন্তানদের প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে শেখাই, কিন্তু পরাজয়কে মর্যাদার সঙ্গে মেনে নিতে শেখাই না। আমরা তাদের কথা বলতে শেখাই, কিন্তু কখন নীরব থাকতে হয়, তা শেখাই না। ফলে জ্ঞানের সঙ্গে বিনয়ের যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, তা ক্রমেই শিথিল হয়ে পড়ছে।
জ্ঞানের যাকাত পরিশোধ মানে নিজের অহংকারকে সংযত করা। এটি দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং আত্মশক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ। কারণ রাগকে জয় করা অন্যকে জয় করার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করতে পারা, উত্তর দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নীরব থাকতে পারা এবং অপমানের মুখেও নিজের ভাষা ও চরিত্রকে অমলিন রাখা— এ এক অনন্য নৈতিক সাহস, যা কেবল জ্ঞানী মানুষের পক্ষেই সম্ভব।
আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে এই নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ প্রয়োজন। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে আমরা যদি ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং মতভিন্নতাকে সম্মান করার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, তবে আমাদের জ্ঞান কেবল তথ্যের ভারে ন্যুব্জ হবে, প্রজ্ঞার আলোয় উদ্ভাসিত হবে না। কারণ জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কের বিষয় নয়, এটি হৃদয়েরও অনুশীলন।
হযরত আলী (রা.)-এর এই কালজয়ী বাণী আমাদের তাই নতুন করে ভাবতে শেখায়— প্রকৃত জ্ঞানী কে? তিনি কি সেই ব্যক্তি, যিনি সর্বদা শেষ কথাটি বলেন? নাকি তিনি, যিনি প্রয়োজনে নীরব থেকে নিজের চরিত্র, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার দীপ্তিকে অম্লান রাখেন? উত্তরটি আমাদের সবারই জানা।
সময়ের কাছে আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা হলো— জ্ঞানের সঙ্গে বিনয়কে, প্রজ্ঞার সঙ্গে সহিষ্ণুতাকে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে আত্মসংযমকে পুনরায় একসূত্রে গাঁথা। কারণ জ্ঞানের প্রকৃত অলংকার বাক্পটুতায় নয়, ধৈর্যে; তার প্রকৃত যাকাত বিতর্কে নয়, সহনশীলতায়।
যে জ্ঞান মানুষকে নম্র করে না, সে জ্ঞান অসম্পূর্ণ; আর যে ধৈর্য মানুষকে মহৎ করে তোলে, সেই ধৈর্যই জ্ঞানের সর্বোত্তম যাকাত।