
১২৯ বছরের ঐতিহ্য, ৩১৪ শিক্ষার্থী আর একদল স্বপ্নবাজ মানুষের নিরলস সাধনা
Π আতাউর রহমান
জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ গ্রহণ করেন খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফসা বেগম, তখন সেটি ছিল কেবল একটি পদক গ্রহণের মুহূর্ত নয়; বরং ১২৯ বছরের এক শিক্ষা-ঐতিহ্যের দীর্ঘ সাধনা, সংগ্রাম ও সাফল্যের প্রতীক।

প্রশ্ন হলো, কীভাবে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেশের সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করল? এর পেছনের গল্পটা কী?
উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে বিদ্যালয়টির প্রতিদিনের পাঠশালায়, যেখানে শ্রেষ্ঠত্ব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং ধারাবাহিক পরিকল্পনা, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকতা, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশ এবং একটি সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রয়াসের ফসল।
১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজও তার ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৮০ শতক ভূমির ওপর গড়ে ওঠা বিদ্যালয়টি একটি এক-শিফটের প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এখানে ৩১৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে, যার মধ্যে ১৫৬ জন ছাত্র এবং ১৫৮ জন ছাত্রী। নয়জন শিক্ষকের (পুরুষ-২, মহিলা-৭) সমন্বয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষক পরিবারটি শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মাণ করেছে একটি আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার পরিবেশ।
কিন্তু সাফল্যের গল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো—এ বিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়।
বিদ্যালয়টিতে নিয়মিত দেয়ালিকা প্রকাশ, শিশুনাট, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান মেলা, গণিত অলিম্পিয়াড এবং কাবিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্তমানে ৪৮ জন কাব সদস্য বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চায় সম্পৃক্ত। জাতীয় পর্যায়ে সাতজন শাপলা কাব অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সাফল্য বিদ্যালয়ের সহশিক্ষা কার্যক্রমকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
শিক্ষার্থীদের শতভাগ বার্ষিক মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়া এবং প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে সাতটি বৃত্তি অর্জন নিঃসন্দেহে বিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষতার প্রমাণ বহন করে। প্রতিদিন পঞ্চম শ্রেণিতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনা, প্রায় ২০০ বইয়ের গ্রন্থাগার এবং শিশুকেন্দ্রিক পাঠদান শিক্ষার্থীদের শেখাকে করেছে আরও আনন্দময় ও কার্যকর।
তবে খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাফল্যের গল্প শুধু অর্জনের নয়, সংগ্রামেরও।
যে বিদ্যালয় আজ জাতীয় পর্যায়ের পদক অর্জন করেছে, সেই বিদ্যালয়ের প্রবেশপথের পাশেই প্রতিদিন জমা হয় আবর্জনার স্তূপ। বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হাঁটুপানি জমে থাকে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জলাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই এগিয়ে যেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। প্রশ্ন জাগে—যে বিদ্যালয় সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও দেশের সেরা হওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করেছে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা পেলে তার সম্ভাবনা কতদূর বিস্তৃত হতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বিদ্যালয়ের মানুষগুলোর মধ্যে।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন হাফসা বেগম। এর আগে তিনি মাস্টার ট্রেইনার (বাংলা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কাবিংয়ে উডবেজার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই শিক্ষাবিদ তেরাদল-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নবাং সুতারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষকবৃন্দ শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতিভা বিকাশের জন্য গড়ে তুলেছেন একটি অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা সংস্কৃতি।
বিদ্যালয়ের অর্জনের পেছনে শিক্ষকদের নিবেদন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অভিভাবকদের আস্থা, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সক্রিয় সহযোগিতা এবং স্থানীয় জনগণের আন্তরিক সম্পৃক্ততা। ২০২৬ সালের ১৪ মে অনুমোদিত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিও শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ তাই কেবল একটি পুরস্কার নয়; এটি প্রমাণ করে যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল আধুনিক ভবন কিংবা বিপুল সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে না। সঠিক নেতৃত্ব, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকতা, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশ এবং একটি সমাজের সম্মিলিত দায়বদ্ধতাই পারে একটি বিদ্যালয়কে জাতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করতে।
খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ—এই অর্জনকে টেকসই করা। আবর্জনামুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং আরও অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে জাতীয় পর্যায়ের সাফল্যের ধারায় সম্পৃক্ত করাই হতে পারে আগামী দিনের অঙ্গীকার।
জাতীয় পর্যায়ের এই পদক বিয়ানীবাজারের গর্ব। তবে এই গর্বের সঙ্গে জুড়ে আছে রাষ্ট্র ও সমাজেরও এক নতুন দায়িত্ব। কারণ, একটি বিদ্যালয় যখন সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেও দেশের সেরা হওয়ার গল্প লিখতে পারে, তখন তাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার দায়ও সবার।
খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পদকজয়ের গল্প তাই আমাদের শেখায়—শ্রেষ্ঠত্ব কোনো গন্তব্য নয়, এটি এক নিরন্তর যাত্রা।