
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আব্দুল করিম:
সিলেটের বিয়ানীবাজারে শাহজালাল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ঘিরে অর্থ ফেরত না পাওয়া, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সৃষ্ট সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। এক ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলায় সমিতির দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে, সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আব্দুল মান্নান মিন্টু দাবি করেছেন, এটি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা নয়; বরং মাঠ পর্যায়ে বিতরণ করা বিপুল পরিমাণ ঋণের অর্থ আটকে যাওয়ায় সাময়িক তারল্য সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনায় সামনে এসেছে দুটি ভিন্ন চিত্র। একদিকে, দুই বছর ধরে আমানতের অর্থ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগে ক্ষুব্ধ আমানতকারীরা। অন্যদিকে, সমিতির দাবি—ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় সম্ভব হলে পর্যায়ক্রমে সদস্যদের পাওনা পরিশোধ করা হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ভুক্তভোগী তাহেরা পারভীন শেফা গত ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে (মামলা নং-২৫) আব্দুল মান্নান মিন্টুসহ তিনজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এরই ধারাবাহিকতায় সমিতির ক্যাশিয়ার খালেদা বেগম ও রিসিপশনিস্ট খয়রুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিয়ানীবাজার থানার ওসি আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবির জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
হাজারো আমানতকারীর প্রশ্ন—সঞ্চয়ের অর্থ কবে ফিরবে?
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অধিক মুনাফা ও আকর্ষণীয় লাভাংশের প্রতিশ্রুতিতে তারা সমিতিতে আমানত রাখেন। প্রথমদিকে নিয়মিত লাভাংশ পরিশোধ করা হলেও পরবর্তীতে আমানত ফেরত দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের জমাকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
দাসউরা গ্রামের প্রবাসী সিদ্দিক আহমদের দাবি, সৌদি আরবে কর্মরত অবস্থায় উপার্জিত ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা তিনি সমিতিতে জমা করেছিলেন। দেশে ফিরে সেই অর্থ দিয়ে ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও এখন তিনি অর্থ ফেরতের অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। টাকা চাইতে গিয়ে মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
একই এলাকার জসিম উদ্দিন ও জয়নুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঘুরেও তারা মূলধনের অর্থ ফেরত পাননি। তাদের ভাষ্য, সামান্য কিছু অর্থ দেওয়া হলেও অধিকাংশ আমানতের কোনো হদিস নেই।
মাঠ পর্যায়ে আটকা ঋণের টাকা দাবি মিন্টুর
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে আব্দুল মান্নান মিন্টু বলেন, ২০১৪ সাল থেকে সমবায় আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে সমিতিটি পরিচালিত হয়ে আসছে এবং বিভিন্ন সময়ে উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সমবায় সমিতির স্বীকৃতি লাভ করেছে। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে সমিতির কার্যক্রম ব্যাহত হয়। একই সময়ে অধিকাংশ সদস্য তাদের সঞ্চয়ের অর্থ উত্তোলনের জন্য এলে তারল্য সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
মিন্টুর ভাষ্য, সদস্যদের সঞ্চয়ের বিপরীতে মাঠ পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় না হওয়ায় আমানত ফেরত দিতে বিলম্ব হচ্ছে। তিনি সদস্যদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে সমিতির কার্যক্রম সচল রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
তবে তার এই বক্তব্য নতুন কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। যদি সমিতির অর্থ মাঠ পর্যায়ে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে মোট কত টাকা আদায়যোগ্য রয়েছে? কতজন সদস্য তাদের আমানতের অর্থ ফেরত পাননি? সমিতির ব্যাংক হিসাবগুলোতে বর্তমানে কী পরিমাণ অর্থ রয়েছে? এবং সংকট নিরসনে নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কোনো কর্মপরিকল্পনা আছে কি না—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—সমিতিতে মোট কত টাকার আমানত রয়েছে? মাঠ পর্যায়ে কত টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে? আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ কত? পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্যদের ভূমিকা কী ছিল? সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদন কী বলছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীরা কবে তাদের অর্থ ফেরত পাবেন?
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের সমাধানে শুধু ফৌজদারি মামলার তদন্তই যথেষ্ট নয়; সমিতির আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ, ঋণ বিতরণ ও আদায়ের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক নিরীক্ষা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যদের অর্থ ফেরতের জন্য একটি স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ রূপরেখা প্রণয়ন করাও জরুরি।
অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পাঁচ প্রশ্ন
★ সমিতিতে মোট কত টাকার আমানত রয়েছে?
★ মাঠ পর্যায়ে বর্তমানে কত টাকার ঋণ আদায়যোগ্য?
★ কতজন সদস্য এখনো তাদের পাওনা অর্থ ফেরত পাননি?
★ সমিতির ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের বর্তমান অবস্থা কী?
★ ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যদের অর্থ ফেরতের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা কী?
হাজারো মানুষের জীবনের সঞ্চয় ঘিরে তৈরি হওয়া এই সংকট এখন শুধু একটি মামলার বিষয় নয়; এটি আর্থিক জবাবদিহিতা, সদস্যদের অধিকার এবং সমবায় ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতারও বড় পরীক্ষা। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করার দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।