
আতাউর রহমান:
একটি রাষ্ট্র যখন তার ভবিষ্যতের চেয়ে অতীতের ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হয়, তখন সেটি কেবল আর্থিক সংকটের লক্ষণ নয়; এটি নীতিনির্ধারণের গভীর অসামঞ্জস্যেরও প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ আজ সেই বাস্তবতার মুখোমুখি। বাজেটে শিক্ষা খাতকে ‘অগ্রাধিকার’ বলা হলেও বাস্তবে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যয়ের অগ্রাধিকার তালিকায় শিক্ষা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। প্রশ্ন হলো—যে রাষ্ট্র আগামী প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারে না, সে রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়নের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে করতে পারে?
সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের কথা উচ্চারিত হয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রতিশ্রুতিও বারবার দেওয়া হয়। কিন্তু বাজেটের অঙ্ক এক নির্মম সত্য উন্মোচন করে—শিক্ষার চেয়ে ঋণ এখন রাষ্ট্রের বড় অগ্রাধিকার।
চলতি অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ আগামী অর্থবছরে শুধু পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ শিক্ষা খাতের পুরো বরাদ্দের তিন গুণেরও বেশি অর্থ চলে যাবে অতীতের দায় মেটাতে। এটি নিছক হিসাবের পার্থক্য নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ভাষ্য।
আরও উদ্বেগের বিষয়, এই ঋণের বড় অংশ বৈদেশিক নয়, অভ্যন্তরীণ। উচ্চ সুদের ট্রেজারি বিল, বন্ড এবং সঞ্চয়পত্রনির্ভর ঋণ ব্যবস্থাপনা এমন এক আর্থিক কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে সরকার একদিকে ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণ নিচ্ছে, অন্যদিকে সামাজিক খাতগুলোর জন্য আর্থিক পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি শুধু ঋণের বোঝা নয়; এটি ‘ক্রাউডিং আউট’—যেখানে ঋণের দায় উৎপাদনশীল বিনিয়োগকে সরিয়ে দেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই ঋণ নেওয়া হয়েছিল কী উদ্দেশ্যে এবং সেই অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়েছে? যে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জনগণের ভবিষ্যৎ রাজস্ব বন্ধক রাখা হয়েছে, তার কতগুলো প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল দিয়েছে? কত প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়েছে? কতগুলো প্রকল্পের ব্যয় কয়েক দফা সংশোধন করতে হয়েছে? এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর না থাকলে ঋণ কেবল আর্থিক দায় নয়, জবাবদিহিরও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু গবেষণার আন্তর্জাতিক অবস্থান কি একই হারে উন্নত হয়েছে? সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা অনুদান, ল্যাবরেটরি, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, শিক্ষক উন্নয়ন কিংবা উদ্ভাবনে বিনিয়োগ কতটা বেড়েছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়াল উঠেছে, কিন্তু জ্ঞানচর্চার ভিত কতটা মজবুত হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আশাব্যঞ্জক নয়।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দকে অনেক সময় ব্যয় হিসেবে দেখা হয়। অথচ উন্নত রাষ্ট্রগুলো শিক্ষা ও গবেষণাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূলধন হিসেবে বিবেচনা করে। একজন দক্ষ শিক্ষক, একজন গবেষক কিংবা একজন উদ্ভাবকের পেছনে আজ যে বিনিয়োগ করা হয়, আগামী দশকে তার বহুগুণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল ফিরে আসে। বিপরীতে শিক্ষা থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়ার মূল্য একটি জাতিকে বহু বছর ধরে দিতে হয়।
এখানেই সরকারের নীতিগত দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। অর্থনৈতিক চাপ থাকতেই পারে, কিন্তু প্রতিটি সংকটই রাজনৈতিক ও নীতিগত অগ্রাধিকারকে পরীক্ষা করে। রাষ্ট্র চাইলে কম উৎপাদনশীল ব্যয় পুনর্বিন্যাস করতে পারে, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প স্থগিত রাখতে পারে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিতে পারে এবং শিক্ষা খাতকে ‘সুরক্ষিত ব্যয়’ হিসেবে আইনি বা নীতিগতভাবে সংরক্ষণ করতে পারে। অনেক দেশ ঠিক এই পথেই অর্থনৈতিক সংকট সামলেও শিক্ষা খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেয়নি।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন ঋণ ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক পুনর্বিবেচনা। উচ্চ সুদের স্বল্পমেয়াদি অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। বৈদেশিক উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে শিক্ষা-কেন্দ্রিক ঋণবিনিময় (Debt Swap) উদ্যোগের সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, সংসদে ঋণ গ্রহণ, ঋণের ব্যবহার এবং প্রকল্পের ফলাফল নিয়ে নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের করের অর্থে গঠিত ঋণের দায় জনগণের কাছেই ব্যাখ্যা করার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা ছাড়া আর্থিক শৃঙ্খলা কখনোই সুদৃঢ় হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় যদি আর্থিক শৃঙ্খলা, ব্যয়ের দক্ষতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে একই সূত্রে গাঁথা না যায়, তবে কাঠামোগত সংস্কারের দাবিও অপূর্ণ থেকে যাবে। শিক্ষা খাতকে শুধু বক্তৃতায় নয়, বাজেটের অগ্রাধিকারে স্থান দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ঋণ শোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়া রাষ্ট্রের আরও বড় দায়িত্ব। আজ যদি ঋণের চাপে শিক্ষার মান, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পথ সংকুচিত হয়, তবে আগামী দিনের অর্থনীতিও দুর্বল হয়ে পড়বে। তখন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড থাকবে, ভবন থাকবে, পরিসংখ্যান থাকবে—কিন্তু বিশ্ব প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার মতো জ্ঞানভিত্তিক শক্তি থাকবে না।
রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন বাজেটের অঙ্কই একটি জাতির ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের জন্য সেই মুহূর্ত এখনই। সরকার যদি আজ ঋণ ব্যবস্থাপনায় দূরদর্শিতা, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং শিক্ষা খাতে অটল অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে পারে, তবে এ সংকটই ভবিষ্যতের শক্তিতে রূপ নিতে পারে। অন্যথায় আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করব, যারা জন্মের আগেই ঋণের ভার বহন করবে, কিন্তু সেই ঋণ থেকে মুক্তির জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে না। সেটিই হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।