✍ আতাউর রহমান
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সারাদেশে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটি শুধু একটি মসজিদ নির্মাণ প্রকল্প নয়; ধর্মীয় শিক্ষা, গবেষণা, হিফজ, ইমাম ও হজ প্রশিক্ষণ, ইসলামিক লাইব্রেরি, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজন পূরণের একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠান।
এই কারণেই বিয়ানীবাজারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—দেশের ৪৭৫টি উপজেলা সদরে যখন মডেল মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তখন বিয়ানীবাজারের ক্ষেত্রে উপজেলা সদরকে বাদ দিয়ে চারখাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজন কেন দেখা দিল?
জমি নেই—এটাই কি একমাত্র কারণ?
নাকি জমি ব্যবস্থাপনার জটিলতা নিরসনে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগের ঘাটতিই প্রকল্পটির বাস্তবায়নকে দীর্ঘায়িত করছে?
এ প্রশ্ন এখন বিয়ানীবাজারবাসীর।
সরকারের মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় দেশের ৪৭৫টি উপজেলা সদরে তিনতলা মডেল মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ প্রকল্পটির পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে উপজেলা সদর।
তাহলে বিয়ানীবাজারের ক্ষেত্রে যদি উপজেলা সদর থেকে প্রকল্পটি সরিয়ে চারখাই ইউনিয়নে নেওয়ার চিন্তা করা হয়, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—কোন নীতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এটি করা হবে?
চারখাইয়ের ভৌগোলিক গুরুত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সিলেট-জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার সড়কের সংযোগস্থল হিসেবে চারখাইয়ের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে। সেখানে সরকারি জমি পাওয়া তুলনামূলক সহজ—এমন আলোচনাও রয়েছে।
কিন্তু একটি সরকারি প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া সহজ হলেই কি প্রকল্পের মূল অবস্থান পরিবর্তন করা যায়?
প্রকল্পের জন্য জমি খোঁজা হবে, নাকি জমি যেখানে সহজে পাওয়া যায় সেখানেই প্রকল্প সরিয়ে নেওয়া হবে—এই প্রশ্নটির উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জানা যায়, শুরুতে বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদ চত্বরে বর্তমান জামে মসজিদের পাশের একটি পুকুর ভরাট করে মডেল মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিবেশ ও জলাশয় সংরক্ষণের স্বার্থে পরবর্তীতে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসা হয়।
এটি নিঃসন্দেহে একটি সঠিক ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত।
কিন্তু একটি পুকুর রক্ষা করার পর তো কাজ থেমে থাকার কথা নয়। বরং তখনই শুরু হওয়ার কথা ছিল—সদরের মধ্যে বিকল্প জমি অনুসন্ধান।
প্রশ্ন হলো, সেই অনুসন্ধান কতটা ব্যাপক ছিল?
উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, ভূমি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার জমি কি সমন্বিতভাবে যাচাই করা হয়েছে?
সরকারি অব্যবহৃত জমির তালিকা কি তৈরি করা হয়েছে?
প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণের সম্ভাবনা কি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে?
নাকি একটি জায়গা বাতিল হওয়ার পর প্রশাসনিকভাবে সহজ সমাধান হিসেবে সদর থেকে প্রকল্প সরিয়ে নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে?
বিকল্প হিসেবে বিয়ানীবাজার পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে মেইন রোডের পাশে বর্তমান পাবলিক টয়লেট সংলগ্ন এলাকায় জায়গা নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু জায়গাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন হওয়ায় বিষয়টি প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে—একটি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এক সরকারি সংস্থার জমি ব্যবহার করতে আরেক সরকারি সংস্থার অনুমোদন পেতে এত দীর্ঘ সময় লাগবে কেন?
সরকারি প্রকল্পের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেওয়া কি অসম্ভব?
যদি জমিটি প্রকল্পের উপযোগী না হয়, সেটি স্পষ্টভাবে জানানো হোক। আর যদি উপযোগী হয়, তাহলে কোন প্রশাসনিক বাধায় তা আটকে আছে—সেটিও জনগণের সামনে পরিষ্কার করা হোক।
সিলেট জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মে ২০২৬-এর সভার কার্যবিবরণীতে উপজেলা পরিষদের কাছাকাছি উপযুক্ত ও নিষ্কণ্টক সরকারি জায়গা না পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা যায়।
এখানেই অনুসন্ধানের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—
“উপযুক্ত জমি নেই”—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হলো কীভাবে?
কোন কোন সরকারি জমি পরীক্ষা করা হয়েছে?
কোন জমি কেন বাদ দেওয়া হয়েছে?
কোন জমি পরিবেশগত, আইনগত বা মালিকানা জটিলতার কারণে অযোগ্য হয়েছে?
এসব তথ্য কি লিখিতভাবে নথিভুক্ত আছে?
থাকলে জনগণের সামনে আসুক।
কারণ “জমি নেই” একটি সিদ্ধান্ত; কিন্তু সিদ্ধান্তের পেছনের অনুসন্ধান ও প্রমাণই আসল বিষয়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ছড়িয়েছে—বিয়ানীবাজারের মডেল মসজিদ নাকি চারখাই ইউনিয়নে স্থানান্তর করা হতে পারে।
এটি সত্য হলে প্রশ্ন—এর প্রশাসনিক ভিত্তি কী?
কে প্রস্তাব দিয়েছেন?
কোন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করছে?
কোন নীতিমালার অধীনে উপজেলা সদর থেকে একটি ইউনিয়নে প্রকল্প স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে?
আর যদি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকে, তাহলে এই গুঞ্জনের উৎস কোথায়?
চারখাইবাসীর প্রতি কোনো বিরূপ মনোভাব থাকার প্রশ্নই আসে না। চারখাই বিয়ানীবাজারেরই গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। সেখানে একটি মডেল মসজিদ নির্মাণ হলে স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবেন।
কিন্তু বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পকে সদর থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ধরা যাক, চারখাইয়ে খাস জমি পাওয়া যাচ্ছে এবং সদর এলাকায় জমি পাওয়া কঠিন।
তাহলে কি প্রকল্পটি চারখাইয়ে নিয়ে যাওয়াই একমাত্র পথ?
তাহলে ভবিষ্যতে যে কোনো উপজেলা সদরে জমির সংকট দেখা দিলেই সরকারি প্রকল্প অন্য ইউনিয়নে সরিয়ে নেওয়ার নজির তৈরি হবে।
প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া কঠিন হলে সরকারি জমি খোঁজা হবে, আন্তঃদপ্তর সমন্বয় করা হবে, প্রয়োজন হলে আইনানুগভাবে জমি অধিগ্রহণ করা হবে।
প্রকল্পের নির্ধারিত কেন্দ্র পরিবর্তন হওয়া উচিত সর্বশেষ বিকল্প—প্রথম বিকল্প নয়।
বিয়ানীবাজার মডেল মসজিদ প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা যায়। অথচ জমি চূড়ান্ত না হওয়ায় নির্মাণকাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
এটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রকল্প অনুমোদনের পর জমি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ছিল?
দরপত্রের আগে জমি চূড়ান্ত করা হলো না কেন?
এখন যদি জমির অজুহাতে প্রকল্পের অবস্থান পরিবর্তন করা হয়, তাহলে এতদিনের প্রশাসনিক বিলম্বের দায় কে নেবে?
জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি প্রকল্প এভাবে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকবে—এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।
মডেল মসজিদকে শুধু নামাজের স্থান হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা যাবে না।
এখানে থাকবে ইসলামিক লাইব্রেরি, গবেষণার সুযোগ, হিফজ কার্যক্রম, ইমাম ও হজযাত্রী প্রশিক্ষণ, নারী-পুরুষের পৃথক নামাজের ব্যবস্থা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম।
এ ধরনের একটি বহুমুখী প্রতিষ্ঠান এমন জায়গায় হওয়া উচিত যেখানে মানুষের চলাচল বেশি।
উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা অফিস, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কার্যক্রম যেখানে কেন্দ্রীভূত—সেই উপজেলা সদরই স্বাভাবিকভাবে সবচেয়ে কার্যকর অবস্থান।
সুতরাং প্রকল্পের জায়গা নির্ধারণ শুধু “কোথায় জমি পাওয়া যাচ্ছে” দিয়ে নয়, “কোথায় সবচেয়ে বেশি মানুষ উপকৃত হবে”—এই প্রশ্ন দিয়েও নির্ধারিত হওয়া উচিত।
এই বিতর্ককে কোনোভাবেই চারখাইবাসী বনাম সদরবাসীর দ্বন্দ্বে পরিণত করা উচিত নয়।
চারখাইয়ে মডেল মসজিদ হলে সেটি একটি ইতিবাচক সংযোজন হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—
বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পটি কোথায় হবে?
যদি চারখাইয়ে একটি মডেল মসজিদ প্রয়োজন হয়, আলাদা প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সদর এলাকার জন্য নির্ধারিত প্রকল্পকে সদর থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর সরকারি নথি ও নীতিমালার ভিত্তিতেই দিতে হবে।
বিয়ানীবাজারবাসীর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া জরুরি—
১. বিয়ানীবাজার মডেল মসজিদের অনুমোদিত প্রকল্পে নির্ধারিত স্থান বা অবস্থান কী?
২. উপজেলা সদর থেকে চারখাইয়ে স্থানান্তরের কোনো লিখিত প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত হয়েছে কি?
৩. হয়ে থাকলে এর আইনগত ও নীতিগত ভিত্তি কী?
৪. উপজেলা সদর ও পৌর এলাকায় সরকারি জমির পূর্ণাঙ্গ তালিকা কি যাচাই করা হয়েছে?
৫. সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রস্তাবিত জমির বর্তমান অবস্থা কী?
৬. সদর এলাকায় প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের সম্ভাবনা কেন বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না?
৭. দরপত্র সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ কী এবং এর সমাধানের নির্দিষ্ট সময়সীমা কত?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রকাশ্যে এলে অনেক গুঞ্জনের অবসান ঘটবে।
বিয়ানীবাজারবাসী আর অনিশ্চয়তা চায় না।
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, গণপূর্ত অধিদপ্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত বৈঠক করে দ্রুত সদর এলাকার সম্ভাব্য জমির তালিকা তৈরি করা যেতে পারে।
প্রথমে সরকারি জমি।
তারপর আন্তঃদপ্তর সমন্বয়ে অব্যবহৃত জমি।
প্রয়োজনে আইনানুগ ভূমি অধিগ্রহণ।
সব পথ শেষ হওয়ার পরই স্থানান্তরের প্রশ্ন।
এটাই হওয়া উচিত যৌক্তিক প্রশাসনিক ক্রম।
একটি সরকারি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ গুঞ্জনে নয়, নীতিমালায় নির্ধারিত হওয়া উচিত।
জমি একটি বাস্তব সমস্যা—কিন্তু জমির সমস্যা সমাধানের দায়িত্বও সরকারের।
একটি পুকুর রক্ষা করা যদি সম্ভব হয়, বিকল্প জমি খোঁজাও সম্ভব। একটি সরকারি জমি অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে আন্তঃদপ্তর সমন্বয়ও সম্ভব। প্রয়োজন হলে জমি অধিগ্রহণও আইনসম্মত পথ।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়— কেন এতদিনেও বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরে একটা উপযুক্ত জায়গা বের হলো না?
আর যদি বলা হয়—“জমি নেই, তাই চারখাইয়ে নিতে হবে”, তাহলে পাল্টা প্রশ্ন করতেই হয়—
“জমি নেই, নাকি সদর এলাকায় জমি নিশ্চিত করার মতো প্রশাসনিক সদিচ্ছা নেই”,
বিয়ানীবাজারবাসী কারও বিরুদ্ধে নয়। তাদের দাবি কেবল একটাই—
দেশের অন্যান্য উপজেলা যদি সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী উপজেলা সদরে মডেল মসজিদ পায়, বিয়ানীবাজার কেন পাবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—নথি দিয়ে, নীতিমালা দিয়ে এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে।
চারখাইয়ে মডেল মসজিদ হলে বিয়ানীবাজারবাসীর আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু বিয়ানীবাজার সদরকে বাদ দিয়ে সেই প্রকল্প সরিয়ে নেওয়া হলে প্রশ্ন উঠবেই।
কারণ—
মডেল মসজিদ যেখানে-সেখানে একটি ভবন নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি জনকল্যাণমূলক অঙ্গীকার।
সেই অঙ্গীকারের বাস্তবায়নেও তাই প্রশ্ন একটাই—” নীতিমালা কি জমির কাছে যাবে, নাকি জমিকে নীতিমালার কাছে আনা হবে?”