
দীর্ঘদিন ধরে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের পাওনা থেকে বঞ্চিত এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অবশেষে স্বস্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ আগস্ট থেকে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের জমে থাকা পাওনা পরিশোধে সরকার ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ দিচ্ছে।
এই অর্থের আওতায় অবসর সুবিধা বোর্ডের প্রায় ৭০ হাজার এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৪৪ হাজার—মোট প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী উপকৃত হবেন।
এবারের অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আইবাস++ (iBAS++) সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফলে অবসর সুবিধার অর্থ পেতে কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন হবে না। এতে অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন পাওনা না পেয়ে দুর্ভোগে থাকা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কষ্ট লাঘব করতেই সরকার এ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।
অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদন নিষ্পত্তির কাজ চলছে।
এ পর্যায়ে প্রায় ৭০ হাজার ১১৫টি আবেদন নিষ্পত্তির পরিকল্পনা রয়েছে। চাকরিকালে মূল বেতনের ৬ শতাংশ হারে জমা দেওয়া চাঁদার ভিত্তিতে অবসর সুবিধার অর্থ নির্ধারণ করা হয়। একজন শিক্ষক-কর্মচারী সর্বোচ্চ প্রায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অবসর সুবিধা পেতে পারেন।
এই পর্যায়ের আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জমা হওয়া প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির কাজ চলছে।
কল্যাণ সুবিধার জন্য চাকরিকালে মূল বেতনের ৪ শতাংশ হারে চাঁদা জমা দেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী সর্বোচ্চ প্রায় আড়াই লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন প্রায় ৫০ হাজার টাকা পেতে পারেন।
এ পর্যায়ের আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
তবে সরকারের ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দে দীর্ঘদিনের সব পাওনা একসঙ্গে পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট মিলিয়ে বর্তমানে ১ লাখ ১৪ হাজারের বেশি আবেদন রয়েছে। সব আবেদন সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি করতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন।
এর মধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ডের প্রায় ৭০ হাজার আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন নিষ্পত্তিতে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ, এবারের বিশেষ বরাদ্দে একটি বড় অংশের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হলেও বাকি আবেদনকারীদের পাওনা পরিশোধে ভবিষ্যতে আরও অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অবসর ও কল্যাণ তহবিলের বড় একটি অংশ শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরিকালে জমা দেওয়া চাঁদা থেকে আসে। অবসর সুবিধার জন্য মূল বেতনের ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ সুবিধার জন্য ৪ শতাংশ হারে অর্থ কেটে রাখা হয়।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়—এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসর তহবিলে এবং ৩০ টাকা কল্যাণ তহবিলে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
কিন্তু প্রতি মাসে যে পরিমাণ আবেদন জমা পড়ে, তা নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় তহবিলের আয় কম হওয়ায় নিয়মিত অর্থসংকট তৈরি হয়। ফলে বছরের পর বছর আবেদন জমতে থাকে এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয়।
এর সঙ্গে পুরোনো সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ায় ডিজিটালভাবে আবেদন যাচাইয়ের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছিল। অনেক আবেদন হাতে-কলমে যাচাই করতে হওয়ায় নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় আরও সময় লেগেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৩ আগস্ট এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরবেন শিক্ষামন্ত্রী। এরপর ১৫ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে অর্থ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে নিজের বেতন থেকে নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার পরও অবসর-পরবর্তী প্রাপ্য অর্থের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে অসংখ্য শিক্ষক-কর্মচারীকে। তাই সরকারের এই বিশেষ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে তাদের জন্য স্বস্তির খবর।
তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—প্রথম ধাপের পাশাপাশি অবশিষ্ট সব আবেদনকারীর পাওনাও যেন একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পরিশোধের জন্য ধারাবাহিক ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়।
কারণ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এই অর্থ কোনো অনুদান নয়; চাকরিজীবনে নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার মাধ্যমে অর্জিত তাদের ন্যায্য প্রাপ্য।