
“মসজিদ আল্লাহর ঘর, এটি নিয়ে কোনো রাজনীতি করা যাবে না”—মতবিনিময় সভায় এমপি
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিয়ানীবাজার: বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণে দ্রুত স্থান নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হলে উপজেলা সদরেও মডেল মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা যেতে পারে। এ কাজে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতায় তিনি পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বাদ মাগরিব বিয়ানীবাজার উপজেলা কনফারেন্স হলে বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ বাস্তবায়ন নাগরিক উদ্যোগ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মে হাবিবা মজুমদার।
সভায় মডেল মসজিদ বাস্তবায়নের দাবিতে মূল বক্তব্য দেন নাগরিক উদ্যোগের আহ্বায়ক, কলামিস্ট ও লেখক মো. আতাউর রহমান। তিনি শুরুতেই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পূর্ববর্তী সাক্ষাতের পর বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হওয়ায় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মডেল মসজিদ প্রসঙ্গ জানার পর তাঁর নেওয়া প্রতিটি ইতিবাচক উদ্যোগেরও তিনি প্রশংসা করেন।
আতাউর রহমান বলেন, মডেল মসজিদ বিয়ানীবাজারবাসীর কাছে শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামিক সংস্কৃতি, নৈতিকতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও জনকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে। তাই স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারি গাইডলাইন, জনস্বার্থ, যোগাযোগব্যবস্থা, জমির পরিমাণ, মালিকানা ও ভবিষ্যৎ ব্যবহারযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে নাগরিক উদ্যোগের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। সেখানে উপজেলা সদরকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্ভাব্য স্থানগুলো সরেজমিনে যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চারটি প্রস্তাব
সভায় নাগরিক উদ্যোগের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য কয়েকটি স্থান তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—
১. নয়াগ্রাম মৌজা: ১০৩ নং জে.এল.-এর ৭ নং খতিয়ানের ৮৬৩, ৮৬৪, ৮৬৫, ৮৬৬ ও ৮৭৭ নং দাগে মোট ০.৪৩ একর ভূমি, যার রেকর্ডীয় মালিক বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদ। পূর্বে প্রাক্তন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আশিক নূর এ ভূমি মডেল মসজিদের জন্য সুপারিশ করেছিলেন বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
২. খশির মৌজা: ৬৪ নং জে.এল.-এর ১ নং খতিয়ানের ৩০৯ নং দাগে ১ একর ভূমি, যার রেকর্ডীয় মালিক বাংলাদেশ সরকার, পক্ষে জেলা প্রশাসক, সিলেট। সভায় জানানো হয়, জমির শ্রেণি ‘খাল’ হওয়ায় স্থানটি বর্তমানে বিবেচনার বাইরে রয়েছে।
৩. বিয়ানীবাজার থানা মসজিদ: থানা মসজিদ সম্প্রসারণ অথবা সংলগ্ন সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ভূমি।
৪. খাসা দিঘির পাড় জামে মসজিদ: মসজিদ সম্প্রসারণের সম্ভাব্য ও প্রধান সড়কসংলগ্ন ভূমি।
নাগরিক উদ্যোগের আহ্বায়ক বলেন, কোনো নির্দিষ্ট স্থান চাপিয়ে দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং সম্ভাব্য স্থানগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে সরকারি গাইডলাইনের আলোকে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করাই তাদের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, “মসজিদ কোথায় হবে—এর চূড়ান্ত ফয়সালা মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই হবে। আমরা কেবল তাঁর বান্দা হিসেবে সঠিক জায়গাটি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছি। সঠিক নিয়ত, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও জনস্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ইনশাআল্লাহ উত্তম পথই খুলে যাবে।”
“মসজিদ নিয়ে কোনো রাজনীতি করা যাবে না”—এমপি
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, “মসজিদ আল্লাহর ঘর। এই পবিত্র মসজিদ নির্মাণ নিয়ে কোনো রাজনীতি করা যাবে না।”
তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হতে পেরে তিনি কৃতজ্ঞ এবং “আমি আপনাদের খাদেম”—এই মনোভাব নিয়ে তিনি কাজ করছেন।
মডেল মসজিদ প্রকল্পের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী এমপি বলেন, এটি আগের সরকারের প্রকল্প এবং নির্মাণ প্রক্রিয়ার বিলম্ব অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে বিষয়টি এভাবে চলে আসছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মসজিদ প্রকল্পটি টিকিয়ে রাখার বিষয়েও তিনি কথা বলেছেন।
তিনি জানান, স্থান নির্বাচনের জন্য আব্দুল্লাহপুর, বৈরাগীবাজার, জিরো পয়েন্ট ও চারখাই এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ বিষয়টি মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে।
এমপি বলেন, “সময় খুবই কম। এক সপ্তাহের মধ্যে জায়গা নির্ধারণ করা গেলে উপজেলা সদরেও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা যাবে। যেকোনো চেষ্টায় আমাকেও সঙ্গে পাবেন। আমি তো আপনাদেরই প্রতিনিধি।”
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, মডেল মসজিদ নির্মাণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। স্থানীয় রাজনীতিবিদদের অনেকেই প্রকল্পটির গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেননি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জনস্বার্থের রাজনীতির আহ্বান
সভায় নাগরিক উদ্যোগের আহ্বায়ক আতাউর রহমান বলেন, রাজনীতি মানুষের জন্য। যে রাজনীতি জনস্বার্থ থেকে দূরে সরে যায়, সে রাজনীতি সমাজের প্রকৃত মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। তাই মডেল মসজিদের মতো একটি ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে রেখে বৃহত্তর বিয়ানীবাজারের স্বার্থে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, উপজেলা সদরে কিংবা সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী সর্বাধিক উপযুক্ত স্থানে দ্রুত মডেল মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হলে নাগরিক উদ্যোগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন মডেল মসজিদ বাস্তবায়ন নাগরিক উদ্যোগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য মো. নজরুল হোসেন, পঞ্চখণ্ড গোলাবিয়া পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক শাহেদ আহমদ, সচিব মো. জমির হোসাইন, যুগ্ম সচিব হুমায়ুন কবীর আকিল, উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমদ রেজা এবং পৌরসভা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান রুমেল।
সভায় নাগরিক উদ্যোগের নেতৃবৃন্দ, উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।