সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০২:১৭ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ: প্রভাব নয়, সরকারি গাইডলাইনই হোক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রশাসনের জবাবদিহি ও অভিযোগের শালীনতা অবসরভাতা পেতে আর ভোগান্তি নয়, অনলাইনেই শিক্ষকদের অ্যাকাউন্টে যাবে পাওনা: প্রধানমন্ত্রী সিলেটের ট্রিপল মার্ডারে নতুন মোড়: প্রেমের গল্পের আড়ালে কি জমি বিরোধ? দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান: অবসরভাতা ও কল্যাণ সুবিধা পাচ্ছেন ১ লাখ ১৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বিয়ানীবাজারে সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের নতুন নেতৃত্বে তোফায়েল-অলিউর মন্ত্রিসভায় রদবদলের জোর আলোচনা, ভাগ হতে পারে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দৈনিক ঘোষণা’র বর্ষসেরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হলেন সাদিক হোসেন এপলু ঠাকুরগাঁওয়ের ‘ঘরের ছেলে’ মির্জা ফখরুল, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নে উচ্ছ্বাস তিনটি লাশ, অসংখ্য প্রশ্ন: মানবিকতার সংকটে বাংলাদেশ

বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ: প্রভাব নয়, সরকারি গাইডলাইনই হোক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

  • প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

✍️ লেখক- আতাউর রহমান

বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ নিয়ে আলোচনা এখন আর শুধু একটি স্থাপনার স্থান নির্বাচনকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি নীতিমালা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, জমি নির্বাচন, নাগরিক প্রত্যাশা এবং প্রভাব বিস্তারের নানা প্রশ্ন। ফলে বিষয়টি যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই প্রয়োজন হচ্ছে আবেগ ও পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে নথি, নীতিমালা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।

আমাদের অবস্থান খুব পরিষ্কার—মডেল মসজিদ কোথায় হবে, সে সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে নয়; সংশ্লিষ্ট সরকারি গাইডলাইন ও প্রকল্পের উদ্দেশ্যের আলোকে হতে হবে।

● গাইডলাইন যখন আছে, বিতর্ক কেন?

মডেল মসজিদের স্থান নির্বাচনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত গাইডলাইনে বেশ কিছু সুস্পষ্ট বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ন্যূনতম ৪০ শতক জমি, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স অথবা জেলা শহর/শহরতলির নিকটবর্তী উপযুক্ত স্থান, প্রধান সড়কের পাশে জমি, যোগাযোগের সুবিধা এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগের বিষয় বিবেচনা করা।

অর্থাৎ স্থান নির্বাচন কোনো ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি একটি নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।

তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন—গাইডলাইন অনুসরণ করে সম্ভাব্য জমি যাচাই-বাছাই করার পরও কেন সিদ্ধান্তহীনতা থাকবে?

বিয়ানীবাজারের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পূর্ববর্তী সরকারি নথিপত্রে জমি অনুসন্ধান, সরেজমিন তদন্ত এবং প্রস্তাব প্রেরণের নজির রয়েছে। ২০১৫ সালের সরেজমিন তদন্তে খাসা মৌজার ৯২৬, ৯২৭, ৯২৮ ও ৮৭৫ নম্বর দাগের জমি নিয়ে তথ্য উঠে আসে। পরবর্তী প্রশাসনিক নথিতেও জমি নির্বাচন ও প্রস্তাবের বিষয়টি অগ্রসর হয়েছে। এমনকি ০.৪৩ একর বা ৪৩ শতক জমির একটি প্রস্তাব এবং তার সম্ভাব্য মূল্য ১ কোটি ১৮ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৯ টাকার হিসাবও নথিতে এসেছে।

এসব নথি যদি সত্যিই সরকারি প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলোর বর্তমান অবস্থাও জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

● প্রকল্পটি কোথায় হওয়ার কথা—সেটিই আগে পরিষ্কার হোক

মডেল মসজিদ প্রকল্পটি কোনো সাধারণ স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প নয়। এটি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্প। এর উদ্দেশ্য শুধু একটি মসজিদ নির্মাণ নয়; ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামিক সংস্কৃতি, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমের জন্য একটি আধুনিক কেন্দ্র গড়ে তোলা।

তাই উপজেলা পর্যায়ের একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্থান নির্বাচনে প্রশাসনিক কেন্দ্র, যোগাযোগ, জনগণের সহজ প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতা গুরুত্ব পাওয়াই স্বাভাবিক।

এখানে কোনো এলাকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রশ্ন নেই। চারখাই বিয়ানীবাজারেরই অংশ, খাসাও বিয়ানীবাজারেরই অংশ। উপজেলার যে কোনো স্থানে উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেলে সেটি নীতিমালা অনুযায়ী বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু উপযুক্ততার প্রশ্নটি নির্ধারণ করতে হবে তথ্য দিয়ে, পরিচয় দিয়ে নয়।

● প্রভাবের অভিযোগ উঠলে স্বচ্ছতা আরও জরুরি

বর্তমানে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরছে—কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব কি সরকারি গাইডলাইনের বাইরে গিয়ে স্থান নির্বাচনে ভূমিকা রাখছে?

যদি প্রস্তাবিত কোনো স্থান সরকারি গাইডলাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে তার পক্ষে প্রশাসনিক যুক্তি প্রকাশ করা হোক। আর যদি কোনো স্থান নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ না করে থাকে, তাহলে সেটিকে কীভাবে উপযুক্ত বিবেচনা করা হচ্ছে—তার ব্যাখ্যাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই আসা উচিত।

সরকারি সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার স্বচ্ছতা।

● নাগরিক উদ্যোগের অবস্থান কারও বিরুদ্ধে নয়

বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ বাস্তবায়ন নাগরিক উদ্যোগের পক্ষ থেকে উপজেলা সদরে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। এ দাবির ভিত্তি কোনো ব্যক্তি বা এলাকার প্রতি বিরূপ মনোভাব নয়; বরং সরকারি গাইডলাইন, উপজেলা সদরের প্রশাসনিক গুরুত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সুবিধার বিষয়গুলো।

নাগরিক উদ্যোগ স্মারকলিপি দিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও সংসদ সদস্যের দৃষ্টিতেও এনেছে। এটি একটি নাগরিক অধিকার ও দায়িত্বের অংশ।

তবে নাগরিক উদ্যোগের অবস্থানও হওয়া উচিত নীতিনিষ্ঠ—সদরেই করতে হবে, অন্য কোথাও কোনোভাবেই নয়—এমন অন্ধ অবস্থান নয়; বরং সরকারি গাইডলাইনে যে স্থান সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত, সেখানেই দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।

● ‘সদর বনাম ইউনিয়ন’ প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়

আমরা যদি আলোচনাটিকে ‘সদর বনাম ইউনিয়ন’ কিংবা ‘এক এলাকা বনাম অন্য এলাকা’ বানিয়ে ফেলি, তাহলে মূল বিষয়টি আড়ালে পড়ে যাবে।

মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—
➤ প্রস্তাবিত জমি কি সরকারি গাইডলাইন পূরণ করে?
➤ ন্যূনতম জমির পরিমাণ কি রয়েছে?
➤ প্রধান সড়কের সঙ্গে যোগাযোগ কেমন?
➤ উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স বা শহর-শহরতলির সঙ্গে দূরত্ব কত?
➤ জনগণের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে কি?
➤ প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য পূরণ হবে কি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি নথি ও সরেজমিন যাচাইয়ের মাধ্যমে পাওয়া যায়, তাহলে বিতর্কের অবকাশ অনেকটাই কমে যাবে।

● কর্তৃপক্ষের কাছে এখন পাঁচটি প্রত্যাশা

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা খুবই সংগত—
প্রথমত, মডেল মসজিদের স্থান নির্বাচনের বর্তমান অবস্থান প্রকাশ করা হোক।

দ্বিতীয়ত, পূর্বে প্রস্তাবিত জমি, সরেজমিন তদন্ত ও প্রশাসনিক প্রতিবেদনের বর্তমান অবস্থা জানানো হোক।

তৃতীয়ত, সম্ভাব্য সব স্থান সরকারি গাইডলাইনের আলোকে তুলনামূলকভাবে যাচাই করা হোক।

চতুর্থত, কোনো প্রভাব বা চাপ নয়—লিখিত নীতিমালা ও প্রমাণযোগ্য প্রশাসনিক যুক্তিকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি করা হোক।

পঞ্চমত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকর সময়সূচি নির্ধারণ করা হোক।

● শেষ কথা
বিয়ানীবাজারের মানুষ একটি মডেল মসজিদ চান। তারা বিতর্ক চান না, বিভাজন চান না, আঞ্চলিক বিরোধও চান না। তারা চান—রাষ্ট্র যে প্রকল্পটি তাদের জন্য অনুমোদন করেছে, সেটি যথাযথ স্থানে, যথাযথ প্রক্রিয়ায় এবং দ্রুত বাস্তবায়িত হোক।

এ কোনো প্রভাব কিংবা মতামত থাকতে পারে। নাগরিক সমাজেরও মতামত থাকবে। কিন্তু সরকারি প্রকল্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মানদণ্ড হওয়া উচিত আইন, বিধি, সরকারি গাইডলাইন, বাস্তবতা ও জনস্বার্থ।

আমাদের দাবি একটাই—

“প্রভাব নয়, গাইডলাইন কথা বলুক; আঞ্চলিকতা নয়, জনস্বার্থ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হোক।”

বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ নিয়ে আর দীর্ঘসূত্রতা নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নথি যাচাই করুন, গাইডলাইন প্রয়োগ করুন, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত দিন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যান।

কারণ মডেল মসজিদের ভিত্তি যেন কোনো প্রভাবের ওপর নয়—ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত, সরকারি নীতিমালা ও জনগণের আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

লেখক পরিচিতি :
আহবায়ক: বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ বাস্তবায়ন নাগরিক উদ্যোগ-২০২৬, □ সাবেক সভাপতি: বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব, □ শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক-২০২৪: বিয়ানীবাজার উপজেলা।

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews