পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক :
একজন মানুষকে ঘিরে কখনো কখনো বদলে যায় একটি শহরের আলোচনার বিষয়। ঠাকুরগাঁওয়েও এখন তেমনই এক আবহ। চায়ের আড্ডা, রাজনৈতিক কার্যালয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা গ্রামের হাট—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাস।
দলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই জেলা বিএনপির কার্যালয়ে নেতাকর্মীরা মিষ্টি বিতরণ করেন। শহর থেকে গ্রাম—বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয় অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা বিনিময়। অনেকের কাছে এটি শুধু একজন রাজনীতিকের মনোনয়ন নয়; বরং ঠাকুরগাঁওয়ের একজন সন্তান দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনা।
ঠাকুরগাঁও শহরের প্রাণকেন্দ্র কালীবাড়ি এলাকায় বেড়ে ওঠা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরিতে যুক্ত ছিলেন। আশির দশকে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের পর ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্বের যাত্রা শুরু করেন।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার উত্থান ঘটে ধাপে ধাপে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে তিনি একসময় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে ২০১৬ সালে দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন মির্জা ফখরুল। দলীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি রাজপথের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ফলে রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়নের খবরে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়াই স্বাভাবিক।
ঠাকুরগাঁও সদরের আকচা ইউনিয়নের কৃষক রমজান আলী বলেন, “ফখরুল সাব হামার ঘরের লোক। বছরের পর বছর লড়াই-সংগ্রাম করার পর উনি আইজ সর্বোচ্চ সম্মান পাইতেছেন—এই খবর শুনেই হামার কলিজা জুড়ায়ে গেছে।”
গ্রামবাংলার এই কথায় রাজনৈতিক বিশ্লেষণের চেয়ে স্থানীয় মানুষের আপনজন ভাবনাটিই বেশি স্পষ্ট। তাদের কাছে মির্জা ফখরুল জাতীয় পর্যায়ের একজন নেতা হওয়ার পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়েরই মানুষ।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও মনোনয়ন ঘিরে আগ্রহ দেখা গেছে। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রিফাত বলেন, “তার শিক্ষা, জ্ঞান ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার। তিনি বঙ্গভবনে গেলে এটি আমাদের জন্যও গর্বের বিষয় হবে।”
মির্জা ফখরুলের শিক্ষক পরিচয়টিও স্থানীয়দের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ঠাকুরগাঁও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক তাপস দেবনাথ বলেন, একজন সাবেক শিক্ষক দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে গেলে তা শিক্ষক সমাজের জন্যও মর্যাদার বিষয়। তার কাছ থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যাশা থাকবে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী বলেন, “মির্জা ফখরুল শুধু বিএনপির সম্পদ নন, তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের পরীক্ষিত নেতা। তার মনোনয়ন দীর্ঘ ত্যাগ ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি। আমরা আশা করি, তিনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পেলে সফলভাবে তা পালন করবেন।”
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বাইরে থেকেও বিষয়টিকে জেলার মর্যাদার সঙ্গে দেখছেন অন্য দলের নেতারা। জেলা জামায়াতের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কফিলউদ্দিন আহমদ বলেন, “দলীয় আদর্শে ভিন্নতা থাকতেই পারে। তবে ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন জেলার জন্য গৌরবের। দায়িত্ব পেলে তিনি দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন—এটাই প্রত্যাশা।”
মনোনয়নের খবর ঘিরে আনন্দের পাশাপাশি সচেতন মহল রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকার কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। সুজনের ঠাকুরগাঁও জেলার নাজমুল ইসলাম বলেন, মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সংসদীয় অভিজ্ঞতা তাকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করতে পারে। সংবিধানের মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য রক্ষায় তার কাছ থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করা যায়।
এখন অপেক্ষা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপের। আর ঠাকুরগাঁওবাসীর চোখ সেই সম্ভাব্য মুহূর্তের দিকে, যখন তাদের পরিচিত ‘ফখরুল সাব’ দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বে আসীন হবেন।
তার আগ পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের চায়ের আড্ডায় আলোচনা চলবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসবে শুভেচ্ছার ঢল, আর কোনো এক গ্রামের উঠোনে হয়তো আবারও উচ্চারিত হবে সেই আপন কথাটি—“ফখরুল সাব তো হামারই মানুষ!”