বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:১৮ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
তিনটি লাশ, অসংখ্য প্রশ্ন: মানবিকতার সংকটে বাংলাদেশ অটোপাশের দিন শেষ, মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের গড়ে উঠতে হবে: এমপি এমরান চৌধুরী বিয়ানীবাজারে ইয়াবা ও ভারতীয় নেশাজাতীয় সিরাপসহ ৫ জন গ্রেফতার রায়নগরে বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতিসহ তিনজনকে গলা কেটে হত্যা মডেল মসজিদ নিয়ে বিতর্ক নয়, চাই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত ও দ্রুত বাস্তবায়ন ৪৭ কোটি টাকায় বিয়ানীবাজার-সারপার-গঁজুকাটা সড়কের উন্নয়ন শুরু বিয়ানীবাজারে মডেল মসজিদ সদরেই নির্মাণের দাবিতে ইউএনওকে স্মারকলিপি বিয়ানীবাজারে মডেল মসজিদ সদরেই নির্মাণের দাবিতে নাগরিক কমিটি গঠন এমপিওভুক্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা আর অনিশ্চয়তায় নয়—১৫ আগস্ট থেকে নতুন উদ্যোগ বিয়ানীবাজারের মডেল মসজিদ: জমি নেই, নাকি সদরের জন্য সদিচ্ছা নেই?

তিনটি লাশ, অসংখ্য প্রশ্ন: মানবিকতার সংকটে বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৮ বার পড়া হয়েছে

আতাউর রহমান

সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় তিনটি নিথর দেহ—একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তাঁদের গৃহকর্মী তাহমিনা। একটি বাসার ভেতর সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু সিলেট নগরীকেই নয়, গোটা সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে—মানুষ এতটা নির্মম হয় কীভাবে?

আরও বড় প্রশ্ন—আমরা কি এমন একটি সমাজ নির্মাণ করছি, যেখানে মানুষের ঘরও আর নিরাপদ নয়?

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক বাবুল মিয়া পরিকল্পনা করে ছুরি নিয়ে ওই বাসায় প্রবেশ করে এবং ধারাবাহিকভাবে তিনজনকে হত্যা করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি ও রক্তমাখা ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পূর্ণ পটভূমি জানতে তদন্ত চলছে।

অতএব বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে অপরাধের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেওয়া সমীচীন নয়। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড আমাদের যে সামাজিক প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

প্রেম যখন অধিকারবোধে পরিণত হয়

প্রাথমিকভাবে যে সম্পর্কের কথা সামনে এসেছে, সেটিকে ‘প্রেম’ বলে অভিহিত করা হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার—প্রেম কখনো হত্যার অধিকার দেয় না।

প্রত্যাখ্যাত হওয়া অপরাধ নয়। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া অপরাধ নয়। কারও প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়াও অপরাধ নয়।

অপরাধ শুরু হয় তখন, যখন একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে নিজের সম্পত্তি ভাবতে শুরু করে; যখন ‘না’কে মেনে নেওয়া যায় না; যখন অভিমান প্রতিশোধে পরিণত হয়; আর প্রতিশোধ শেষ পর্যন্ত রক্তপাত ডেকে আনে।

এই মানসিকতার বিরুদ্ধে পরিবার, শিক্ষা ও সমাজ—সব জায়গায় নতুন করে কাজ করতে হবে।

তিনটি লাশের সামনে দাঁড়িয়ে ভুক্তভোগীদের কাঠগড়ায় তোলা যাবে না

এই ঘটনার পর নানা প্রশ্ন উঠতে পারে—প্রবীণ দম্পতি একা থাকতেন কেন? তাঁদের সন্তানরা বিদেশে কেন? গৃহকর্মীর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তাঁরা কতটা জানতেন?

প্রশ্ন করা যেতে পারে। কিন্তু ভুক্তভোগী হওয়া কোনো অপরাধ নয়।

একজন বৃদ্ধ মানুষ নিজের ঘরে নিরাপদে থাকবেন—এটাই স্বাভাবিক। সন্তানরা বিদেশে থাকবেন—এটি পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হতে পারে। একজন গৃহকর্মীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক সম্পর্কে নিয়োগকর্তা সবকিছু জানবেন—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

কোনো ক্ষেত্রেই এসব বিষয় একজন মানুষকে হত্যার নৈতিক দায়ে দায়ী করে না।

অপরাধীর অপরাধকে ভুক্তভোগীর জীবনযাপন দিয়ে ব্যাখ্যা করা বিপজ্জনক। কারণ এতে অপরাধীর দায় আড়াল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে সন্তানদের জন্যও একটি প্রশ্ন আছে

এ কথা সত্য—প্রবাসী সন্তানদের জীবন সংগ্রাম, দায়িত্ব ও বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তাঁরা হয়তো বাবা-মায়ের জন্য অর্থ পাঠিয়েছেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন, নিয়মিত যোগাযোগও রেখেছেন।

তবু এই ঘটনা আমাদের একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে বাধ্য করে।

আমাদের অসংখ্য প্রবীণ বাবা-মা আজ সন্তানদের থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসবাস করছেন। অর্থনৈতিকভাবে তাঁরা হয়তো নিরাপদ; কিন্তু মানসিক ও সামাজিকভাবে কতটা নিরাপদ?

পরিবার কি শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্বের নাম, নাকি সঙ্গ, নিরাপত্তা ও পাশে থাকারও নাম?

এই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেক পরিবারকে নিজেদের মতো করে খুঁজতে হবে।

রাষ্ট্রের দায় সবচেয়ে বড়

একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্বগুলোর একটি হলো নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

অবশ্যই পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই সব অপরাধ আগাম ঠেকাতে পারে না। কিন্তু অপরাধের ঝুঁকি কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, দ্রুত তদন্ত, আধুনিক ফরেনসিক ব্যবস্থা, কার্যকর বিচার এবং অপরাধের শিকার মানুষের জন্য সহজলভ্য নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সিলেটের এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত তাই হতে হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানভিত্তিক।

সিসিটিভি ফুটেজ, আলামত, ফরেনসিক রিপোর্ট, কল রেকর্ড, ডিজিটাল তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির বক্তব্য—সবকিছু বিশ্লেষণ করে প্রকৃত সত্য জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।

কারণ তিনটি হত্যার বিচার শুধু তিনটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি ভবিষ্যতে আরও অনেক জীবন রক্ষার প্রশ্ন।

আমাদের শিক্ষা কোথায়?

আমরা সন্তানদের ভালো ফলাফল শেখাই, ভালো চাকরি শেখাই, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে শেখাই।

কিন্তু কতটা শেখাই—

কীভাবে প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে হয়?

কীভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়?

কীভাবে সম্পর্কের সীমারেখা সম্মান করতে হয়?

কীভাবে একজন নারী বা পুরুষের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে মর্যাদা দিতে হয়?

কীভাবে সংকটের সময় সহিংসতার পরিবর্তে আইনের আশ্রয় নিতে হয়?

মানবিক শিক্ষা ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনো পূর্ণ শিক্ষা হতে পারে না।

একজন মানুষ ডিগ্রিধারী হয়েও যদি অন্য মানুষের জীবনকে নিজের ইচ্ছার অধীন মনে করে, তবে তার শিক্ষার কোথাও না কোথাও গভীর ঘাটতি রয়ে গেছে।

সমাজের অন্ধকার শুধু যৌনতার নয়, মানবিকতার

আমাদের সমাজে নানা ধরনের অবক্ষয় আছে। অর্থনৈতিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, মাদক, অনলাইন আসক্তি, সহিংস ভাষা, প্রতিহিংসা—সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা কমে যাচ্ছে।

তাই প্রতিটি নৃশংস ঘটনাকে শুধু ‘যৌন বিকৃতি’ বা ‘প্রেমঘটিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখলে আমরা সমস্যার গভীরে যেতে পারব না।

সমস্যার মূল আরও গভীরে—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতা আমরা হারাচ্ছি কি না।

একজন গৃহকর্মী মানুষ। একজন শ্রমিক মানুষ। একজন বৃদ্ধ মানুষ। একজন নারী মানুষ। একজন প্রবাসী মা-বাবাও মানুষ।

তাঁদের প্রত্যেকের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তার সমান মূল্য রয়েছে।

আমরা কি ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন হয়ে যাচ্ছি?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন আমরা হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, প্রতারণা ও সহিংসতার খবর দেখি।

প্রথমে শিউরে উঠি। তারপর মন্তব্য করি। তারপর পরের খবরের দিকে চলে যাই।

এটাই কি আমাদের নতুন স্বাভাবিকতা?

একটি সমাজের সবচেয়ে ভয়াবহ পতন তখনই ঘটে, যখন মানুষের মৃত্যু আর মানুষকে দীর্ঘক্ষণ কাঁদায় না।

রায়নগরের তিনটি মৃত্যু যেন আমাদের সেই অনুভূতিহীনতার বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা।

‘হাবিয়া দোজখ’ থেকে বের হওয়ার পথ

বাংলাদেশকে ‘হাবিয়া দোজখ’ বলা সহজ। কিন্তু এই অন্ধকার থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করা কঠিন।

তার জন্য দরকার—

মানবিক পরিবার, নৈতিক শিক্ষা, আইনের প্রতি আস্থা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, নাগরিক নিরাপত্তা, প্রবীণদের জন্য সামাজিক সহায়তা, শ্রমজীবী ও গৃহকর্মীদের মর্যাদা, সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান।

আর সবচেয়ে বেশি দরকার—মানুষের প্রতি মানুষের মমতা।

শেষ কথা

রায়নগরের তিনটি লাশ আমাদের সামনে তিনটি পরিবার, তিনটি জীবন এবং তিনটি অসমাপ্ত গল্প রেখে গেছে।

তাঁদের মৃত্যু নিয়ে আমরা যতই আলোচনা করি, তাঁদের আর ফিরিয়ে আনতে পারব না।

কিন্তু আমরা চাইলে এই মৃত্যুগুলোকে একটি পরিবর্তনের সূচনা করতে পারি।

আমরা চাইলে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে প্রেম প্রতিশোধে পরিণত হবে না; প্রত্যাখ্যান হত্যার কারণ হবে না; বৃদ্ধ বাবা-মা একা থাকলেও নিজেদের অসহায় মনে করবেন না; গৃহকর্মী বা শ্রমজীবী মানুষকে সন্দেহের চোখে নয়, মর্যাদার চোখে দেখা হবে; আর নাগরিক নিজের ঘরের দরজার ভেতরেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না।

খুনি একজন হতে পারে; কিন্তু মানবিক সমাজ নির্মাণের দায়িত্ব আমাদের সবার।

রায়নগরের রক্ত তাই শুধু শোকের স্মৃতি হয়ে থাকুক—এটা আমরা চাই না।

এই রক্ত আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলুক। আমাদের রাষ্ট্রকে আরও মানবিক করুক। আমাদের পরিবারকে আরও কাছে আনুক।আমাদের শিক্ষাকে আরও নৈতিক করুক।

আর আমাদের মনে করিয়ে দিক—

তিনটি লাশের সামনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি এখনো মানুষ আছি?

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews