পঞ্চখণ্ড আই অনলাইন ডেস্ক :
সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্তিকে সামনে রেখে মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। কয়েকজনের দপ্তর পুনর্বণ্টন, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ করা, নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তি এবং প্রয়োজনে কয়েকজনকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
বিশেষ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণার পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্বশীল কে আসছেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনা আরও বেড়েছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রণালয়গুলোকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ছয় মাস পর এসব পরিকল্পনার অগ্রগতি মূল্যায়নের কথাও বলা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য রদবদলে রাজনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি মন্ত্রণালয় পরিচালনায় কর্মদক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, জনভোগান্তি নিরসন, সংসদে জবাবদিহি এবং সরকারের ভাবমূর্তিতে ভূমিকা গুরুত্ব পাবে।
সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিষয়ে মাঠপর্যায়ের তথ্য, প্রশাসনিক সমন্বয় ও কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তবে কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ না থাকলে সরাসরি বাদ না দিয়ে দপ্তর পরিবর্তন বা সতর্ক করে আরও সময় দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকতে পারে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী আসা প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আব্দুল মঈন খান—তিনজনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সালাহউদ্দিন আহমদকে আপাতত সেখানেই রাখার সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে। এ ছাড়া এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ে বর্তমান প্রতিমন্ত্রীকে বহাল রাখার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
বর্তমানে কয়েকজন মন্ত্রী একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এতে প্রশাসনিক কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত গতি ব্যাহত হচ্ছে বলে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সামলাচ্ছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। শেখ রবিউল আলমের হাতে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া আমিন উর রশিদ ইয়াছিন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ ও পরিকল্পনা, ফকির মাহবুব আনাম স্বপন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আরিফুল হক চৌধুরী শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
এই অতিরিক্ত দায়িত্বের কিছু অংশ ভাগ করে নতুন মুখকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
সম্ভাব্য রদবদরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সেলিমা রহমানের নাম নতুন মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি শরিক ও সমমনা দলগুলোর কয়েকজন নেতাকেও মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল-এর নামও আলোচনায় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ-এর নামও সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তির আলোচনায় রয়েছে।
সম্ভাব্য পরিবর্তনের তালিকায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন-এর নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। তাঁদের দপ্তর পরিবর্তন কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এবং কৃষি খাতের কয়েকটি কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়েও সরকারের উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়েও পরিবর্তনের আলোচনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সব মিলিয়ে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিবর্তে দপ্তর পুনর্বণ্টন, অতিরিক্ত দায়িত্ব ভাগ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তির দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন সদস্যের ভাষ্য, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্বশীল আসবেন—এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে কে দায়িত্ব পাবেন বা মন্ত্রিসভায় আর কী পরিবর্তন হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর।
ফলে আগামী কয়েক দিনে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদলের চূড়ান্ত চিত্র। এখন পর্যন্ত আলোচনায় থাকা নাম ও দায়িত্ব বণ্টনকে সম্ভাব্যতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে; আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো তালিকাকেই চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না।