সিলেট থেকে বিশেষ প্রতিনিধি:
সিলেট নগরীর রায়নগর রাজবাড়ি আবাসিক এলাকায় ব্যবসায়ী ও সাবেক চেম্বার পরিচালক আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড় দেখা দিয়েছে। এতদিন পুলিশ প্রাথমিকভাবে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়ার সম্পর্ক ও কথিত বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে আনলেও নিহত দম্পতির পরিবারের পক্ষ থেকে করা লিখিত অভিযোগে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের জমিসংক্রান্ত বিরোধ, মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি এবং পরিকল্পিত হত্যার আশঙ্কার কথা।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাতে নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে অভিযোগটি দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তাঁর বাবার সঙ্গে একটি জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল এবং এ বিরোধের জেরে তাঁকে বিভিন্ন সময়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়।
তবে পরিবারের অভিযোগ এখনো তদন্তে প্রমাণিত নয়। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগে উত্থাপিত বিষয় এবং বাবুল মিয়াকে ঘিরে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য—দুই দিক বিবেচনায় নিয়েই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সেলিনা সুলতানার অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর বাবা এম এ সাত্তার ১৯৯৭ সালে সিলেট পুলিশ লাইন্স লুসাই গির্জা সমিতির কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরফপুর এলাকায় প্রায় ১২ শতক জমি ইজারা নিয়ে বসবাস শুরু করেন। পরে ২০০৬ সালে ইম্পালস বিজনেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ওই জমিসহ সমিতির আরও জমির মালিকানা দাবি করেন।
এ নিয়ে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেন আব্দুস সাত্তার। এরপর মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেলিনার ভাষ্য, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলামসহ কয়েকজন তাঁদের বাসায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। এ সময় বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে তাঁদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আদালত প্রাঙ্গণেও আব্দুস সাত্তারকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁর বাবা, মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন সেলিনা।
নিহত দম্পতির মেয়ে তাঁর অভিযোগে দাবি করেছেন, জমিসংক্রান্ত বিরোধ ও চলমান মামলাগুলোর কারণেই ‘পেশাদার ভাড়াটে খুনি’ ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হতে পারে।
তাঁর আরও দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে জমিসংক্রান্ত দলিল, মামলা ও জিডির কপি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তসাপেক্ষ। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়টি আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়াকে আটক করে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রংমিস্ত্রির কাজের সূত্রে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও রক্তমাখা ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। বাসার ভেতরের আলামত এবং উদ্ধার করা ছুরি ও ব্যাগ ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।
তবে নিহত পরিবারের সদস্যরা এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেলিনা সুলতানার দাবি, ‘তিনটি মার্ডার এই ছেলেটা করতে পারে না। এর পেছনে বড় কোনও হাত আছে।’
তাঁর ভাষ্য, গৃহকর্মী তাহমিনাকে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে সামনে এনে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে।
তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের কথিত সম্পর্কের প্রসঙ্গে সেলিনা সুলতানা বলেন, তাঁর মা গৃহকর্মী তাহমিনাকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। তিনি তাহমিনাকে পরিবারের কাছে ‘আমানত’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, মেয়েটির কাছে কোনো মোবাইল ফোনও ছিল না।
অর্থাৎ নিহত পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাহমিনার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের যে ব্যাখ্যা সামনে এসেছে, সেটি তারা বিশ্বাস করছেন না।
এখানেই তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো স্বার্থগত বিরোধ রয়েছে?
১২ আগস্ট সকালে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে একই দিন বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ।
পরদিন তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
এখন তদন্তকারীদের সামনে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—একদিকে বাবুল মিয়াকে ঘিরে পাওয়া আলামত ও পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য; অন্যদিকে নিহত পরিবারের উত্থাপিত জমি বিরোধ, মামলা প্রত্যাহারের হুমকি এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ।
দুই দিকের যেকোনো একটিকে আগেভাগে সত্য ধরে নেওয়া হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
নিহত দম্পতির সন্তানরা দেশে ফিরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। সেলিনা সুলতানা বলেছেন, তাঁর বাবা-মায়ের মতো আর কোনো মা-বাবার যেন এমন পরিণতি না হয়। আর তাঁর ভাই আরিফ ইফতেখার জানিয়েছেন, তাঁরা বাবুলকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের ফল দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
অন্যদিকে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি খান মোহাম্মদ মাঈনুল জাকির জানিয়েছেন, নিহত দম্পতির মেয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এজাহারে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আব্দুস সাত্তারের বিরোধের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ এবং পুলিশের হাতে থাকা তথ্য—দুই দিক সামনে রেখেই তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে।
সিলেটের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে আবেগের চেয়ে তথ্য-প্রমাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
বাবুল মিয়া যদি এককভাবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তবে কীভাবে তিনি তিনজনকে হত্যা করলেন, তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত কী প্রমাণ করে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে স্পষ্ট হতে হবে।
আবার পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী যদি জমিসংক্রান্ত বিরোধের কোনো যোগসূত্র থাকে, তবে সেই দিকটিও সমান গুরুত্বে তদন্ত করতে হবে। হত্যার আগে দেওয়া হুমকি, আদালত ও থানায় করা অভিযোগ, জমির দলিল, নিখোঁজ কাগজপত্র, আর্থিক বা সম্পত্তিগত স্বার্থ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ—সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ তিনটি প্রাণের হত্যাকাণ্ড কোনো একটি অনুমানের ওপর দাঁড় করিয়ে তদন্ত শেষ করার মতো ঘটনা নয়।
সিলেটের রায়নগরের এই ট্রিপল মার্ডারের প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হোক—প্রেম, প্রতিশোধ, সম্পত্তি বিরোধ কিংবা এর পেছনে অন্য কোনো কারণ; সত্য যাই হোক, তা যেন নিরপেক্ষ তদন্ত ও শক্ত প্রমাণের ভিত্তিতেই জাতির সামনে আসে।