লেখক-Π আতাউর রহমান
সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি সমাজের প্রতি একটি নৈতিক অঙ্গীকার। সত্যকে খুঁজে বের করা, অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা এবং সাধারণ মানুষের কথা রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে তুলে ধরাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম তাই শুধু সংবাদ প্রকাশ করে না—সমাজের বিবেককে জাগ্রত রাখে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকতার পরিচয় ও পেশাগত মর্যাদা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হাতে একটি প্রেসকার্ড, কোনো অনলাইন পেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম থাকলেই কেউ নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। কেউ কেউ সংবাদ সংগ্রহের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, সুবিধা আদায় কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তির অনৈতিকতার পরিচয় নয়; এর দায় এসে পড়ে পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—শিক্ষাগত যোগ্যতা কম হওয়া কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য সাংবাদিক বানায় না, আবার হাতে প্রেসকার্ড থাকাও কাউকে নৈতিক ও পেশাগতভাবে প্রকৃত সাংবাদিকের মর্যাদা দেয় না। সাংবাদিকতার আসল পরিচয় নির্ধারিত হয় পেশাগত দক্ষতা, সত্যনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, নিরপেক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকৃত কর্মসম্পর্কের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের মূল দর্শনও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা এবং সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার মান বজায় রাখার সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন ও পেশাগত মান উন্নয়নের দায়িত্বও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি এর সঙ্গে দায়িত্ব ও জবাবদিহিও অবিচ্ছেদ্য।
এখানেই আমাদের একটি প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা প্রয়োজন। প্রেসকার্ড সাংবাদিকের পরিচয়পত্র হতে পারে, কিন্তু প্রেসকার্ড নিজেই সাংবাদিকতার নৈতিক সনদ নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্ড থাকলেই সংবাদ প্রকাশের নামে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অধিকার সৃষ্টি হয় না।
একজন সাংবাদিকের প্রথম পরিচয় তাঁর কাজের মধ্যে। তিনি তথ্য যাচাই করবেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেবেন, গুজব ও সত্যের মধ্যে পার্থক্য করবেন এবং সংবাদ ও মতামতকে যথাসম্ভব পৃথক রাখবেন। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, তথ্যের একাধিক উৎস যাচাই করা এবং শিরোনামে অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি না করা—এসবই পেশাগত নৈতিকতার অংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোথাও কোথাও সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যবহার করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি, আর্থিক সুবিধা দাবি কিংবা সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখানোর অভিযোগ শোনা যায়। যদি সত্যিই এমন ঘটনা ঘটে, তা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নয়; বরং স্বাধীনতার অপব্যবহার।
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের শক্তি তাঁর পরিচয়পত্রে নয়—তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতায়। তিনি কারও কাছে মাথা নত করবেন না, আবার কাউকে অকারণে হেয়ও করবেন না। প্রশাসনের ভুল হলে প্রশ্ন করবেন, জনপ্রতিনিধির অনিয়ম হলে তুলে ধরবেন, সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাজনৈতিক পক্ষপাত বা আর্থিক স্বার্থকে সংবাদে পরিণত করবেন না।
গণতান্ত্রিক সমাজে মুক্ত সাংবাদিকতা অপরিহার্য। গণমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে বা নিয়ন্ত্রণ করে কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না। একইভাবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার নামে মিথ্যা, অপপ্রচার, চরিত্রহনন কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ পরিবেশনের সুযোগও থাকা উচিত নয়।
তাই সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে—যে কাউকে শুধু একটি পরিচয়পত্র দিয়ে মাঠে পাঠানো নয়, তাঁর প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব ও পেশাগত আচরণও নিশ্চিত করতে হবে।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা রক্ষায় পেশার নাম ব্যবহার করে যারা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নবীন সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সাংবাদিকতার নীতিমালা এবং তথ্য যাচাইয়ের কৌশল শেখানো জরুরি।
সাংবাদিকতার মান উন্নয়নের দায়িত্ব শুধু সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের নয়; পাঠক ও দর্শকেরও ভূমিকা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো লেখা বা ভিডিও দেখেই সেটিকে সংবাদ হিসেবে গ্রহণ না করে তথ্যের উৎস, গণমাধ্যমের পরিচিতি এবং সংবাদটির সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
আজকের ডিজিটাল যুগে একটি মিথ্যা তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই ‘আগে প্রকাশ, পরে যাচাই’ নয়—হতে হবে ‘আগে যাচাই, তারপর প্রকাশ’।
সাংবাদিকতা মানুষের আস্থা নিয়ে কাজ করে। সেই আস্থা একবার নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। তাই প্রকৃত সাংবাদিককে যেমন তাঁর স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, তেমনি সেই স্বাধীনতার মর্যাদাও রাখতে হবে।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো প্রেসকার্ড নয়, কোনো পদবিও নয়—বিশ্বাসযোগ্যতা। সত্যের প্রতি আনুগত্য, তথ্যের প্রতি সততা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন সাংবাদিককে প্রকৃত সাংবাদিক করে তোলে।
অতএব, সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় এখন প্রয়োজন পেশার পরিচয়ের চেয়ে পেশাগত নৈতিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। সাংবাদিকতা যেন কারও ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার না হয়ে সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের পক্ষে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়ায়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা।