মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৫৮ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
আজ নানকার দিবস: শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সিলেটের কৃষকের ঐতিহাসিক বিদ্রোহের স্মরণ বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি এম এ সাত্তারের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শোক ও প্রতিবাদ সভা নিউইয়র্কে শ্রীধরার আতিকুর রহমানের মমতাময়ী মায়ের ইন্তেকাল, পারিবারিক কবরস্থানে দাফন বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ: প্রভাব নয়, সরকারি গাইডলাইনই হোক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রশাসনের জবাবদিহি ও অভিযোগের শালীনতা অবসরভাতা পেতে আর ভোগান্তি নয়, অনলাইনেই শিক্ষকদের অ্যাকাউন্টে যাবে পাওনা: প্রধানমন্ত্রী সিলেটের ট্রিপল মার্ডারে নতুন মোড়: প্রেমের গল্পের আড়ালে কি জমি বিরোধ? দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান: অবসরভাতা ও কল্যাণ সুবিধা পাচ্ছেন ১ লাখ ১৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বিয়ানীবাজারে সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের নতুন নেতৃত্বে তোফায়েল-অলিউর মন্ত্রিসভায় রদবদলের জোর আলোচনা, ভাগ হতে পারে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব

আজ নানকার দিবস: শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সিলেটের কৃষকের ঐতিহাসিক বিদ্রোহের স্মরণ

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৮ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:
আজ ১৮ আগস্ট—ঐতিহাসিক নানকার দিবস। জমিদারি শোষণ, সামন্তবাদী নিপীড়ন ও বংশপরম্পরায় চলে আসা নানকার প্রথার বিরুদ্ধে সিলেটের কৃষক-জনতার ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়। বিশেষ করে বিয়ানীবাজারের সানেশ্বর-উলুউরি ও লাউতা-বাহাদুরপুর অঞ্চল নানকার আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

‘নানকার’ শব্দটি উর্দু ‘নান’ ও ‘কার’ থেকে এসেছে—‘নান’ অর্থ রুটি এবং ‘কার’ অর্থ কাজ বা যোগান। অর্থাৎ খাবারের বিনিময়ে শ্রমদানকারী মানুষকে নানকার বলা হতো। কিন্তু বাস্তবে নানকার প্রথা ছিল কেবল শ্রমের বিনিময়ে খাদ্য পাওয়ার ব্যবস্থা নয়; এটি ছিল জমিদার ও মিরাশদারদের অধীনে প্রজাদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক শোষণের এক নির্মম কাঠামো।

নানকারদের সামান্য জমি ও বসতভিটা ভোগের সুযোগ থাকলেও তার ওপর তাদের প্রকৃত মালিকানা ছিল না। জমিদারের বাড়িতে বিনা মজুরিতে কাজ করা, গৃহস্থালির নানা দায়িত্ব পালন এবং জমিদারের নির্দেশ অমান্য করলে নির্যাতনের শিকার হওয়া ছিল তাদের জীবনের বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে এই নির্ভরশীলতা বংশপরম্পরায় চলত।

এই অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ১৯২০-এর দশক থেকেই বৃহত্তর সিলেটে কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠতে শুরু করে। বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জ ও ধর্মপাশাসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষক সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের সহযোগিতায় নানকারদের সংগঠিত করা হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় বিয়ানীবাজারকে নানকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সূতিকাগার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই আন্দোলনে অজয় ভট্টাচার্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সঙ্গে শিশির ভট্টাচার্য, ললিত পাল, জোয়াদ উল্ল্যা, আব্দুস সোবহান ও শৈলেন্দ্র ভট্টাচার্যসহ অনেকে নানকার কৃষকদের সংগঠিত করতে কাজ করেন। বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে বরুণ রায় ও হেনা দাসের নামও ইতিহাসে উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে।

নানকার আন্দোলন ক্রমে জমিদারি কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিরোধে রূপ নেয়। কৃষকেরা খাজনা দেওয়া বন্ধ করেন, জমিদারদের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন এলাকায় জমিদার ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এতে জমিদারদের সঙ্গে কৃষকদের সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৯ সালের আগস্টে বিয়ানীবাজারের সানেশ্বর ও উলুউরি এলাকায় সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ নানকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক অধ্যায় হয়ে ওঠে। সরকারি বাহিনী ও জমিদারপক্ষের সশস্ত্র লোকজনের সঙ্গে নানকার কৃষকদের সংঘর্ষে প্রাণ হারান কয়েকজন কৃষক। ঐতিহাসিক বর্ণনায় রজনী দাস, ব্রজনাথ দাস, কুটুমনি দাস, প্রসন্ন কুমার দাস, পবিত্র কুমার দাস ও অমূল্য কুমার দাসের নাম শহিদ হিসেবে স্মরণ করা হয়।

এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নারী নেতৃত্বও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অপর্ণা পাল, সুষমা দে ও অসিতা পালসহ নারীরা কৃষকদের সংগঠিত ও প্রতিরোধে ভূমিকা রাখেন। আন্দোলনের সময় অপর্ণা পাল চৌধুরী গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাবন্দি ছিলেন—যা নানকার আন্দোলনে নারীদের আত্মত্যাগের একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত।

নানকারদের রক্ত, ত্যাগ ও দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আমলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পথ তৈরি হয়। ১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন জমিদারি ব্যবস্থার অবসানে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে। এর মধ্য দিয়ে নানকারসহ ভূমির অধিকারবঞ্চিত কৃষকদের ওপর দীর্ঘদিনের সামন্তীয় নিয়ন্ত্রণের অবসানের পথ সুগম হয়।

নানকার বিদ্রোহ তাই শুধু একটি স্থানীয় কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস নয়; এটি ভূমির অধিকার, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় এবং শোষণমুক্তির দাবিতে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিয়ানীবাজারের মাটিতে যে কৃষকেরা জীবন ও রক্ত দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগ আজও অধিকারবঞ্চিত মানুষের সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে আছে।

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews