সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৭ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সহকারীর প্রশংসা: অভিযোগের নেপথ্যে কী? সংকটকে পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে: তারেক রহমান বিয়ানীবাজার পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেলেন নজমুল হোসেন শ্রীধরায় এসএসসি উত্তীর্ণ ৩৯ শিক্ষার্থী সংবর্ধিত মডেল মসজিদ বাস্তবায়ন নাগরিক উদ্যোগের এক মাসের অর্জন ও অগ্রগতি পোড়া রোগীর চিকিৎসায় দক্ষতা বাড়াতে চীন সফরে ডা. আবু ইসহাক আজাদ রূপকের দশটি শিক্ষা: একজন বাবার রেখে যাওয়া নৈতিক উত্তরাধিকার শিকড়ের টানে আশেক আহমদ আসুক—শিক্ষার অগ্রযাত্রায় অনন্য অবদান যার যোগ্যতা নেই, সে কেন যোগ্যতার আসনে? দুই মামলায় কারাগারে পল্লব: বিয়ানীবাজারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানকে জেলহাজতে পাঠালেন আদালত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সহকারীর প্রশংসা: অভিযোগের নেপথ্যে কী?

  • প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে

অভিযোগের নেপথ্যে কী?

শিক্ষকদের প্রশংসা থেকে অনুসন্ধানে, নথিতে মিলল ভিন্ন চিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর রফিকুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের ইতিবাচক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। অনেক শিক্ষক তাকে ‘শিক্ষকবান্ধব’ ও ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

শিক্ষকদের ভাষ্য, জনবল-সংকটের মধ্যেও রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে অফিসের কাজ করে যাচ্ছেন। অফিস সময়ের বাইরেও, এমনকি ছুটির দিনেও তাকে দাপ্তরিক কাজে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতার জন্য শিক্ষকরা তার ওপর নির্ভর করেন বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একের পর এক ইতিবাচক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—একজন অফিস সহকারীকে ঘিরে এত প্রশংসার কারণ কী? এর বিপরীতে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি? থাকলে অভিযোগটি আসলে কী?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এ প্রতিবেদক বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে যান। অনুসন্ধানে উঠে আসে লাসাইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ইমরানা খানমের চাকরি থেকে অব্যাহতি, বেতন উত্তোলন এবং পদ শূন্য ঘোষণাকে ঘিরে একটি অভিযোগের বিষয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সহকারী শিক্ষিকা ইমরানা খানম ১৬ এপ্রিল ২০২৬ থেকে চাকরি ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। কিন্তু তাকে ১৫ মাস যাবৎ বেতন দেওয়া হয়েছে এবং তার পদও যথাসময়ে শূন্য ঘোষণা করা হয়নি—এমন প্রশ্ন তুলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগটি কতটা সত্য, তা যাচাই করতে সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের দিকে নজর দেওয়া হয়।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, সিলেটের ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের একটি অফিস আদেশে দেখা যায়, লাসাইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইমরানা খানমের চাকরি থেকে অব্যাহতির আবেদন উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সুপারিশের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছে। একই আদেশে তার পদটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সাখাওয়াত এরশাদ স্বাক্ষরিত আদেশে ইমরানা খানমের চাকরি থেকে অব্যাহতির কার্যকর তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০২৫ উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘পারিবারিক কারণে চাকরি হতে অব্যাহতি’।

অফিস আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বার্ষিক বেতন প্রতিবেদন অনুযায়ী ইমরানা খানম মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত গ্রেড-১৩-এর ২৮ হাজার ১০০ টাকা বেতন উত্তোলন করেছেন। তার চাকরি পেনশনযোগ্য না হওয়ায় জিপিএফের অবশিষ্ট অর্থের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি বিধি অনুযায়ী তার নিকট কোনো পাওনা থাকলে তা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের সঙ্গে নথির অসঙ্গতি কোথায়?

সরকারি নথিতে যদি ১৬ এপ্রিল ২০২৫ থেকে চাকরি থেকে অব্যাহতি কার্যকর এবং একই সঙ্গে পদটি শূন্য ঘোষণা করা হয়ে থাকে, তাহলে ‘পদ শূন্য হয়নি’—এমন অভিযোগের সঙ্গে নথির স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে।

আবার অভিযোগে ১৬ এপ্রিল ২০২৬ থেকে বিদেশে যাওয়ার কথা বলা হলেও সরকারি অফিস আদেশে অব্যাহতির তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০২৫। অর্থাৎ এখানে এক বছরের তারতম্য রয়েছে।

এই তারিখের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি তথ্যগত ভুল, নাকি অন্য কোনো কারণে এমন হয়েছে—তা নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্র, সুপারিশ, অব্যাহতির আদেশ এবং বেতন-হিসাবের রেকর্ড মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—বিদেশে চলে যাওয়ার পরও ইমরানা খানমকে বেতন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারি অফিস আদেশে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত তার বেতন উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। ফলে পরবর্তী সময়ে কোনো বেতন উত্তোলন হয়ে থাকলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট বেতন বিল, হিসাবরক্ষণ ও ট্রেজারি রেকর্ডে। অর্থাৎ এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মৌখিক বক্তব্যের চেয়ে বেতন বিল ও আর্থিক রেকর্ডই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।

শিক্ষা অফিসের বক্তব্য

বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর রফিকুল ইসলাম অভিযোগটি সত্য নয় বলে জানিয়েছেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নৃপেন্দ্র নাথ সরকারও অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, কোনো সরকারি চাকরিজীবী চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে চাইলে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। সাধারণত এক মাস আগে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের আগে আবেদন না করলে বিধি অনুযায়ী এক মাসের মূল বেতন সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়টি প্রযোজ্য হতে পারে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আবেদনটি সুপারিশসহ নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায় এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চাকরি থেকে অব্যাহতির বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়। ইমরানা খানমের ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে এবং তার পদ শূন্য হয়েছে।

রফিকুল ইসলামকে ঘিরে শিক্ষকদের এত প্রশংসা কেন?

এখানেই ফিরে আসে প্রতিবেদনের শুরুতে ওঠা প্রশ্নটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের মন্তব্যে রফিকুল ইসলামের যে ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে, তার সঙ্গে অভিযোগের চিত্র এক নয়। শিক্ষকদের একটি অংশ বলছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকবান্ধব আচরণ করে আসছেন এবং দাপ্তরিক কাজে সহযোগিতা করছেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রফিকুল ইসলাম ৯ নভেম্বর ২০১১ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করেন এবং এখনও সেখানে কর্মরত।

তবে কোনো ব্যক্তির দীর্ঘদিনের কর্মজীবন বা সহকর্মী-শিক্ষকদের প্রশংসা যেমন তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ নয়, তেমনি অভিযোগ উঠলেই তা অপরাধের প্রমাণ হয়ে যায় না।

আরেকটি ঘটনা কেন আলোচনায়?

অনুসন্ধানের সময় বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক লৎফুল কবীরকে ঘিরে একটি আর্থিক ঘটনার কথাও সামনে আসে।

জানা যায়, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক লুৎফুল কবীরের ট্রেজারির কাজে সহায়তায় অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ উঠে।  এ প্রসঙ্গে অফিস সহকারী জানান, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আর্থিক সংকটে পড়ে তার কাছে আর্থিক ঋণ চাইলে রফিকুল ইসলাম,  লুৎফুল কবীরকে ৫ হাজার ও ২ হাজার টাকা—দুই কিস্তিতে ঋণ নেন। গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অফিসের জানালা দিয়ে তিনি ওই অর্থ পরিশোধ করেন। এ সময় লেনদেন ঘটনাটি সময় নিউজ টিভি সাংবাদিকদের নজরে আসে।

তাহলে মূল অভিযোগ কী?

অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আলোচিত অভিযোগের মূল বিষয় ইমরানা খানমের চাকরি থেকে অব্যাহতি, বেতন এবং পদ শূন্য ঘোষণার প্রক্রিয়াকে ঘিরে। কিন্তু জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সরকারি আদেশে ইমরানা খানমের চাকরি থেকে অব্যাহতি এবং তার পদ শূন্য ঘোষণার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে, অব্যাহতির তারিখ নিয়ে অভিযোগ ও সরকারি নথির মধ্যে এক বছরের পার্থক্য রয়েছে। ফলে অভিযোগটি সত্য কি না—তার চূড়ান্ত উত্তর দিতে হলে সংশ্লিষ্ট মূল নথি, বেতন বিল, ট্রেজারি রেকর্ড এবং পদ শূন্য ঘোষণার দাপ্তরিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে যাচাই করা জরুরি।

একজন সরকারি কর্মচারীকে ঘিরে অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি কোনো অভিযোগকে যাচাই ছাড়া সত্য হিসেবে প্রচার করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ঘটনাতেও তাই প্রশ্নটি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক না হয়ে হওয়া উচিত প্রক্রিয়া ও নথি-কেন্দ্রিক।

ইমরানা খানমের অব্যাহতির আবেদন কবে করা হয়েছিল, কখন তা অনুমোদিত হয়েছে, কোন তারিখ পর্যন্ত তিনি বেতন পেয়েছেন, পদটি কখন শূন্য ঘোষণা হয়েছে এবং বিদেশে যাওয়ার তারিখের সঙ্গে এসব তথ্যের কোনো অসঙ্গতি আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রশংসা কিংবা অভিযোগ—কোনোটিই চূড়ান্ত সত্য নয়; চূড়ান্ত সত্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা সরকারি নথি ও যাচাইযোগ্য তথ্য। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি পরিষ্কার হবে।

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews