
উপ-শিরোনাম:
অপরিকল্পিত বাউন্ডারি ওয়ালে সংকুচিত হতে পারে দর্শক গ্যালারি ও চলাচলের পথ; পুনর্বিবেচনার দাবি শিক্ষানুরাগী, ক্রীড়ামোদী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের
আতাউর রহমান | পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক :
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় মাঠকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ফ্যাসিলিটিজ ডিপার্টমেন্টের আওতায় নির্মাণাধীন সীমানা প্রাচীর (বাউন্ডারি ওয়াল) নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান নকশায় প্রায় আট ফুট উঁচু প্রাচীর নির্মিত হলে শতবর্ষী এ মাঠটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উন্মুক্ততা এবং ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যের একটি বড় অংশ হারাবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ক্রীড়া সংগঠক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের মতবিনিময় করা হয়নি। ফলে উন্নয়নের নামে ঐতিহ্যবাহী মাঠের ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কা এখন সর্বত্র।
সরেজমিনে জানা যায়, বিদ্যালয়ের পশ্চিমাংশে ‘হেডমাস্টারের টিলা’ সংলগ্ন ড্রেনের পাশ দিয়ে উত্তর দিকের প্রধান সড়ক থেকে দক্ষিণে টিলার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এবং উত্তর-পশ্চিম কোণা থেকে উত্তর-পূর্ব কোণা পর্যন্ত প্রাচীর নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভিত্তি নির্মাণের জন্য একাধিক স্থানে খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—যে মাঠটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত, সেটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের মতামতকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হলো না?
প্রায় ১.৮৫ একর আয়তনের এ মাঠটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ নয়; এটি বিয়ানীবাজারের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ঐতিহ্যের প্রতীক। এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, রাজনৈতিক জনসভা, ধর্মীয় সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের ভাষ্য, বড় ফুটবল টুর্নামেন্টে এ মাঠে ২০ থেকে ২৫ হাজার দর্শকের সমাগম ঘটেছে। মাঠটির প্রাকৃতিক ঢালু টিলা ও গ্যালারি দর্শকদের জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা উপজেলা পর্যায়ে তো বটেই, দেশের অনেক স্টেডিয়ামেও বিরল।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বহু জাতীয় নেতা এ মাঠে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নুরুল ইসলাম নাহিদের উদ্যোগে মাঠটির আধুনিকায়ন ও দক্ষিণাংশে পাকা গ্যালারি নির্মাণ করা হয়।
প্রস্তাবিত প্রাচীর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পার্শ্ববর্তী বিয়ানীবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। তাদের দেওয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী দেয়াল নির্মাণ করা হলে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ সংকুচিত হবে এবং স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তারা প্রাচীরটি বিকল্প স্থানে সরিয়ে নির্মাণের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
১৯১৭ সালে শিক্ষানুরাগী জমিদার স্বর্গীয় পবিত্র নাথ দাস তাঁর নিঃসন্তান চাচা হরগোবিন্দ দাসের নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, পবিত্র নাথ দাস বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কথা বিবেচনায় রেখে মাঠটিকে উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, তাঁর উইলে মাঠটি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশনা ছিল এবং সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে এ সংক্রান্ত নথিপত্রের সত্যতা যাচাই করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি একটি জনপদের শতবর্ষী ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে বিকল্প নকশা বা সমাধানের পথ কি অনুসন্ধান করা যায় না?
স্থানীয় ক্রীড়ামোদীরা বলছেন, প্রয়োজনে সীমানা প্রাচীরের নকশা পুনর্বিবেচনা, উচ্চতা কমানো কিংবা বিকল্প স্থানে নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষানুরাগী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্যের প্রতি দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের ভাষায়, “উন্নয়ন চাই, কিন্তু ইতিহাসের বিনিময়ে নয়।”
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠ আজ এক সন্ধিক্ষণে। এখন দেখার বিষয়—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনমত, ঐতিহ্য এবং উন্নয়নের মধ্যে কীভাবে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করে।