
৪২ বছরেও বাড়েনি জনবল, শূন্য ৯০টির বেশি পদ
আতাউর রহমান | পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক: একসময় মাসে ২০০ থেকে ২৫০টি প্রসব সেবা প্রদানকারী এবং জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আজ জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় ধুঁকছে। অনুমোদিত ২১৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১২৮ জন। চিকিৎসক, নার্স ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতিতে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বুধবার (২২ জুলাই) সকাল ৯টায় সরেজমিনে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে গিয়ে টিকা কাউন্টারসহ বিভিন্ন বিভাগে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া যায়। এ সময় সকাল ৮টায় কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনেক সেবাগ্রহীতাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ মনিরুল হক খান বলেন, “যোগদানের পর থেকেই হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকটের বিষয়গুলো বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পদায়ন হচ্ছে না।”
তিনি জানান, চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত ৩০টি পদের বিপরীতে কাগজে-কলমে রয়েছেন ১৪ জন। তবে তাঁদের মধ্যে চারজন বিদেশে এবং তিনজন ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত। বর্তমানে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন মাত্র সাতজন চিকিৎসক। এছাড়া ৩০ জন নার্সের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২২ থেকে ২৩ জন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদেশে অবস্থানরত চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছেন ডা. জুবায়ের আহমেদ সিদ্দিকী (১ মে ২০২৩ থেকে) ও ডা. মো. তানভীরুল ইসলাম (৫ জুলাই ২০২৩ থেকে)। এছাড়া আরও দুজন চিকিৎসক বিদেশে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে ডা. শেগুফতা শারমিন, ডা. রাবিয়া বেগম ও ডা. শারমিন নাহার ডেপুটেশনে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি একজন স্বাস্থ্য সহকারী ও একজন মিডওয়াইফও দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, আগে তিনটি ওয়ার্ডের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বর্তমানে নয়টি ওয়ার্ডের সেবা প্রায় একই জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। হাসপাতালের একটি গাড়ি থাকলেও চালকের বেতন ও জ্বালানি বরাদ্দের অভাবে সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামে মরিচা ধরেছে, পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি রয়েছে এবং ৪২টি বাথরুমের অনেকগুলোই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ার পথে।
এদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের স্মারক নং উজেস্বাক/বিয়ানী/২০২৬/৪৯৯ (তারিখ: ১৬ জুলাই ২০২৬) থেকে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের জন্য মাত্র ৩টি স্বাস্থ্য পরিদর্শক, ৯টি সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক এবং ৪৫টি স্বাস্থ্য সহকারীর পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সে সময় উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার। বর্তমানে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজারে।
স্মারকে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৯৮১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়ন তিনটি ওয়ার্ডে বিভক্ত থাকলেও ২০০৯ সালের ইউনিয়ন পরিষদ আইন অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়ন বর্তমানে নয়টি ওয়ার্ডে বিভক্ত। জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেলেও গত ৪২ বছরে স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য সহকারীর একটি নতুন পদও সৃষ্টি করা হয়নি। এমনকি প্রশাসনিক প্রয়োজনে নতুন ইউনিয়ন গঠিত হলেও সে অনুপাতে জনবল বাড়ানো হয়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করছে, বর্তমান বাস্তবতায় প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন স্বাস্থ্য সহকারী, প্রতি তিনজন স্বাস্থ্য সহকারীর জন্য একজন সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক এবং প্রতি তিনজন সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের জন্য একজন স্বাস্থ্য পরিদর্শক নিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৮ আগস্ট ২০১৬ সালের এক সভায়ও অনুকূল সিদ্ধান্তের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত এ হাসপাতালটি আজ তার পূর্বের সুনাম ও কার্যকারিতা হারিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, জনবল সংকট এবং প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে জনগণ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁদের প্রশ্ন, জনসংখ্যা ও সেবার পরিধি যখন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তখন স্বাস্থ্যখাতের জনবল কাঠামো কেন চার দশক আগের অবস্থাতেই আটকে থাকবে?
সরেজমিনে উপস্থিত কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানান, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে শূন্য পদগুলো পূরণ, মাঠপর্যায়ের জনবল বৃদ্ধি, হাসপাতালের অবকাঠামো সংস্কার এবং সেবাদান প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায়, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।