নিজস্ব প্রতিবেদক, বিয়ানীবাজার:
বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা নিরসনে ‘বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ বাস্তবায়ন নাগরিক উদ্যোগ’ গত এক মাসে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। নাগরিক মতবিনিময়, ৫১ সদস্যের নাগরিক কমিটি গঠন, উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি ও আবেদন, সংসদ সদস্যের সঙ্গে মতবিনিময়, সংশ্লিষ্ট জাতীয় পর্যায়ের কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ, উপজেলা সদরসংলগ্ন ৬৫ শতক ভূমির প্রস্তাব এবং সর্বশেষ খাসাড়িপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের বাটোয়ারা মামলার বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ—সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
নাগরিক উদ্যোগের মূল বক্তব্য শুরু থেকেই স্পষ্ট—কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা এলাকার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নয়; সরকারি গাইডলাইন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য, জনস্বার্থ, যোগাযোগব্যবস্থা ও ভূমির বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন।
গত ৯ আগস্ট ২০২৬ পঞ্চখণ্ড গোলাবিয়া পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত নাগরিক মতবিনিময় সভার মধ্য দিয়ে ‘বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ বাস্তবায়ন নাগরিক উদ্যোগ’-এর যাত্রা শুরু হয়। অনুষ্ঠিত সভায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা অংশ নেন।
সভায় মডেল মসজিদের স্থান নির্ধারণে সরকারি নীতিমালা, প্রকল্পের শর্ত, ভূমির বৈধতা ও প্রাপ্যতা, যোগাযোগব্যবস্থা, জনসাধারণের সহজ প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়।
সভা শেষে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট নাগরিক কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি গঠনের পরদিন ১০ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপিতে উপজেলা সদর ও পৌরসভা এলাকার সম্ভাব্য স্থানগুলো সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী যাচাই-বাছাই এবং ইতোমধ্যে আলোচিত স্থানগুলোর তুলনামূলক মূল্যায়নের দাবি জানানো হয়।
নাগরিক উদ্যোগের বক্তব্য ছিল—মডেল মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামিক সংস্কৃতি, নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেও এর ভূমিকা থাকবে। তাই এর অবস্থান নির্ধারণে সর্বাধিক মানুষের সহজ প্রবেশাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মডেল মসজিদের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চারখাই ইউনিয়নের কামারগ্রাম মৌজায় ০.৫৬০০ একর জমি প্রস্তাব করা হয়েছে। নাগরিক উদ্যোগের পক্ষ থেকে এ স্থানটি পুনরায় যাচাইয়ের যে দাবি জানানো হচ্ছে, তার অন্যতম কারণ হলো প্রস্তাবিত ভূমির শ্রেণিগত বাস্তবতা।
নাগরিক উদ্যোগের কাছে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কামারগ্রামের প্রস্তাবিত ভূমির মধ্যে পুকুর ও ডোবা শ্রেণির জমি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে মডেল মসজিদের মতো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমির শ্রেণি, পরিবেশগত বিষয়, ভরাট বা উন্নয়নযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধিবিধান যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছে।
এ ক্ষেত্রে বিয়ানীবাজার উপজেলা কমপ্লেক্সের জন্য পূর্বে নির্ধারিত একটি স্থানের অভিজ্ঞতাকেও নাগরিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাক্তন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশিক নূর উপজেলা কমপ্লেক্সের নির্ধারিত স্থানে পুকুর শ্রেণির ভূমি অন্তর্ভুক্ত থাকায় যে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে পরিবেশবাদীদের আপত্তির মুখে বাদ পড়ে যায়।
এই পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার আলোকে নাগরিক উদ্যোগ মনে করে, কোনো সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার স্থান নির্ধারণের আগে ভূমির শ্রেণি, পরিবেশগত অবস্থান, আইনগত সীমাবদ্ধতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের উপযোগিতা যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।
এক্ষেত্রে নাগরিক উদ্যোগের বক্তব্য—যে স্থানই প্রস্তাবিত হোক, সেটি একই সরকারি মানদণ্ডে কারিগরি, ভূমি ও পরিবেশগত দিক থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
২৩ আগস্ট নাগরিক উদ্যোগের প্রতিনিধি দল সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
প্রতিনিধি দল উপজেলা সদর ও আশপাশের সম্ভাব্য স্থানগুলো সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়ন, প্রয়োজনে সরেজমিন পরিদর্শন এবং ভূমির পরিমাণ, মালিকানা, শ্রেণি, যোগাযোগব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতার ভিত্তিতে তুলনামূলক মূল্যায়নের দাবি জানায়।
এর ধারাবাহিকতায় ২৪ আগস্ট বাদ মাগরিব বিয়ানীবাজার উপজেলা কনফারেন্স হলে সংসদ সদস্যের সঙ্গে নাগরিক উদ্যোগের কমিটি ও উপজেলা সদর এলাকার ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় দ্রুত স্থান যাচাই ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়।
২৬ আগস্ট নাগরিক উদ্যোগের জরুরি সভায় উপজেলা সদরসংলগ্ন খাসাড়িপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের প্রায় ৬৫ শতক ভূমি মডেল মসজিদ নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে নীতিগতভাবে প্রস্তাব করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর পরদিন ২৭ আগস্ট উপজেলা কনফারেন্স হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত আবেদন পেশ করা হয়।
প্রস্তাবিত ভূমির মধ্যে ৫৩ শতক বাড়ি শ্রেণির এবং মসজিদের নামে রেকর্ডীয় ১২ শতক ভূমি রয়েছে বলে নাগরিক উদ্যোগের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
খাসাড়িপাড়া প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
প্রস্তাবিত ভূমি নিয়ে চলমান বাটোয়ারা মামলার বাদী-বিবাদীদের মধ্যে নাগরিক উদ্যোগের হস্তক্ষেপ ও উদ্যোগে আপোষনামা সম্পাদিত হয়েছে।
আপোষনামার আলোকে আদালত থেকে মামলাটির নিষ্পত্তির ডিক্রি লাভের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
নাগরিক উদ্যোগের মতে, এ অগ্রগতি খাসাড়িপাড়া প্রস্তাবিত ভূমির ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য আইনগত জটিলতা নিরসনের পথ খুলে দিয়েছে।
তবে তাদের দাবি —মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এবং ভূমির আইনগত বিষয় পরিষ্কার হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারি গাইডলাইন ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে।
৩০ আগস্ট নাগরিক উদ্যোগের প্রতিনিধি দল সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
বৈঠকে চারখাই ইউনিয়নের কামারগ্রাম এবং উপজেলা সদরসংলগ্ন খাসাড়িপাড়ার প্রস্তাবিত স্থান দুটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
নাগরিক উদ্যোগের আহ্বায়ক মো. আতাউর রহমান বলেন—
“আমরা জায়গা নিয়ে বিতর্ক চাই না, আমরা মসজিদ চাই।”
জেলা প্রশাসক জানান, চারখাই এলাকার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং নাগরিক উদ্যোগের প্রস্তাবও পাঠানো হবে। উভয় প্রস্তাবিত স্থান সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী সরেজমিনে পরিদর্শন ও যাচাই করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
জমির পরিমাণ, মালিকানা, শ্রেণি, যোগাযোগব্যবস্থা, জনসাধারণের প্রবেশাধিকারসহ প্রয়োজনীয় বিষয় বিবেচনা করে উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা হবে বলে জেলা প্রশাসক জানান। পরদিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সার্ভেয়ার নিয়োগের মাধ্যমে খাসাড়িপাড়া জামে মসজিদের স্কেচ ম্যাপ ও কাগজাদি সংগ্রহ করেন।
গত ৯ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নাগরিক উদ্যোগের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিগুলো হলো—
১. ৫১ সদস্যবিশিষ্ট নাগরিক কমিটি গঠন।
২. উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান।
৩. সংসদ সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়।
৪. উপজেলা সদরসংলগ্ন খাসাড়িপাড়ার ৬৫ শতক ভূমির লিখিত প্রস্তাব পেশ।
৫. মহাপরিচালক, প্রকল্প পরিচালক ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সার্বিক পরিস্থিতি লিখিতভাবে অবহিতকরণ।
৬. জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সম্ভাব্য স্থান সরেজমিনে যাচাইয়ের বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস লাভ।
৭. কামারগ্রামের প্রস্তাবিত ভূমির শ্রেণি ও পরিবেশগত বাস্তবতা পুনর্মূল্যায়নের দাবি উত্থাপন।
৮. খাসাড়িপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের বাটোয়ারা মামলার বাদী-বিবাদীদের মধ্যে ২ সেপ্টেম্বর আপোষনামা সম্পাদন।
৯. আপোষনামার আলোকে আদালতের নিষ্পত্তির ডিক্রি লাভের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়া।
নাগরিক উদ্যোগ মনে করে, মডেল মসজিদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পের স্থান নির্ধারণে শুধু জমির পরিমাণ যথেষ্ট নয়। জমির শ্রেণি, মালিকানা, রেকর্ড, পরিবেশগত অবস্থা, যোগাযোগব্যবস্থা, জনসাধারণের প্রবেশাধিকার, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতা সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কামারগ্রামের প্রস্তাবিত ভূমিতে পুকুর ও ডোবা শ্রেণির জমি থাকার তথ্য এবং অতীতে উপজেলা কমপ্লেক্সের একটি প্রস্তাব পুকুর শ্রেণির ভূমির কারণে পরিবেশগত আপত্তির মুখে বাদ পড়ার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে নাগরিক উদ্যোগ মনে করে।
অন্যদিকে, খাসাড়িপাড়া প্রস্তাবিত ভূমির বাটোয়ারা মামলায় আপোষনামা সম্পাদন এবং আদালতের নিষ্পত্তির ডিক্রি প্রাপ্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়া একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও এটিকেও সরকারি যাচাই-বাছাইয়ের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
নাগরিক উদ্যোগের অবস্থান কোনো একটি স্থানকে জোর করে নির্বাচিত করা নয়।
তাদের বক্তব্য—
“কামারগ্রাম হোক কিংবা খাসাড়িপাড়া—যে স্থান সরকারি গাইডলাইন, ভূমির বৈধতা, পরিবেশগত বাস্তবতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বৃহত্তর জনস্বার্থের বিচারে সবচেয়ে উপযুক্ত, মডেল মসজিদ সেখানেই হোক।”
তারা মনে করে, স্থান নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের আঞ্চলিক বিরোধ বা রাজনৈতিক বিভাজন প্রকল্প বাস্তবায়নকে বিলম্বিত করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল সহযোগিতা প্রয়োজন।
নাগরিক উদ্যোগের আহ্বায়ক মো. আতাউর রহমানের বক্তব্য—
“আমরা জায়গা নিয়ে বিতর্ক চাই না, আমরা মসজিদ চাই।”
আর তাদের বিশ্বাস—
“মসজিদের স্থান শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহই নির্ধারণ করবেন। আমরা কেবল তাঁর বান্দা হিসেবে সঠিক জায়গাটি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছি।”
নাগরিক উদ্যোগের সচিব জমির হোসাইন জানান, গত এক মাসের কার্যক্রমে নাগরিক উদ্যোগের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদের স্থান নির্ধারণের বিষয়টি আবারও জনআলোচনা থেকে প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে এসেছে।
বিশেষ করে একদিকে জেলা প্রশাসকের সরেজমিন যাচাইয়ের আশ্বাস এবং অন্যদিকে খাসাড়িপাড়া প্রস্তাবিত ভূমির বাটোয়ারা মামলায় আপোষনামা সম্পাদনের ফলে বিষয়টি নতুন গতি পেয়েছে।
বিয়ানীবাজারবাসির প্রত্যাশা—দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কারিগরি যাচাই সম্পন্ন করে সর্বাধিক জনস্বার্থসম্মত স্থান নির্ধারণ এবং বিয়ানীবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করা।