— শমশের আলম
মানুষ নিজেকে তার নিজের ভাগ্যের নিয়ন্তা এবং স্বাধীন ইচ্ছার একক মালিক বলে মনে করতে ভালোবাসে। দৈনন্দিন জীবনের ছোট-বড় সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন—সবকিছুতেই মানুষ তার নিজস্ব ‘ইচ্ছা’ ও ‘পছন্দ’-এর ছাপ দেখতে পায়। কিন্তু গভীর তাত্ত্বিক, বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণে মানুষের এই স্বায়ত্তশাসনের দাবি কতটা বাস্তব—সেই প্রশ্নটি আজও গভীর বিতর্কের বিষয়।
মানুষ কখনও আপন ইচ্ছায় চলতে পারে না—
এই বক্তব্য মানুষের অস্তিত্বের এমন এক নির্মম সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে মানুষের চিন্তা, আবেগ, সিদ্ধান্ত ও আচরণ কোনো না কোনো অভ্যন্তরীণ, বাহ্যিক, সামাজিক কিংবা জৈবিক শক্তির দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হয়। মানুষের তথাকথিত ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ অনেক ক্ষেত্রেই অদৃশ্য তাড়না ও শক্তির জটিল আন্তঃক্রিয়ার ফল।
মানুষ প্রকৃতি, সমাজ, ইতিহাস, রসায়ন ও প্রযুক্তির এক জটিল সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সত্তা।
ক্ষুধা তাকে খাদ্যের দিকে তাড়িয়ে নেয়, ভয় তাকে নিরাপত্তার দিকে নিয়ে যায়, আকাঙ্ক্ষা তাকে অর্জনের পথে ঠেলে দেয়, সামাজিক স্বীকৃতির প্রয়োজন তাকে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করে। অর্থাৎ মানুষের আচরণের পেছনে কাজ করে অসংখ্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্য তাড়না।
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান দেখিয়েছে, মানুষের অনুভূতি ও আচরণের সঙ্গে মস্তিষ্কের জটিল রাসায়নিক ও স্নায়বিক প্রক্রিয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আনন্দ, ভয়, পুরস্কারবোধ, সামাজিক বন্ধন ও চাপ—এসবের সঙ্গে ডোপামিন, সেরোটোনিন, অক্সিটোসিন, কর্টিসলসহ বিভিন্ন নিউরোকেমিক্যাল প্রক্রিয়া জড়িত।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো একটি রাসায়নিক একাই মানুষের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। বরং জৈবিক প্রবণতা, পরিবেশ, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও পরিস্থিতি মিলেই মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে।
বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের অনেক মৌলিক প্রবণতার শিকড় নিহিত রয়েছে দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসে।
আত্মরক্ষা, খাদ্যের সন্ধান, বিপদ এড়িয়ে চলা, সামাজিক বন্ধন তৈরি, সঙ্গী নির্বাচন ও সন্তান প্রতিপালনের প্রবণতা—এসব মানুষের অস্তিত্ব ও প্রজাতিগত টিকে থাকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ মানুষ জন্মের পর শূন্য হাতে পৃথিবীতে আসে না। তার শরীর ও মস্তিষ্কের ভেতরেই বহন করে নিয়ে আসে কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ছাপ।
মনস্তত্ত্বের ইতিহাসও মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মানসজগতের সচেতন ও অবচেতন স্তরের পার্থক্য তুলে ধরে দেখিয়েছিলেন—মানুষের আচরণের পেছনে এমন অনেক মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে, যার বিষয়ে ব্যক্তি নিজেই পুরোপুরি সচেতন নয়।
শৈশবের অভিজ্ঞতা, ভয়, ভালোবাসা, প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক পরিবেশ ও সামাজিক অভিজ্ঞতা মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের অনেক সিদ্ধান্তের পেছনে কখনও কখনও এমন অতীত অভিজ্ঞতা কাজ করে, যার উৎস ব্যক্তি নিজেও স্পষ্টভাবে শনাক্ত করতে পারেন না।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন কোনো সত্তা নয়।
মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, যে সংস্কৃতিকে নিজের বলে মনে করে, যে পোশাক পরে, যে সামাজিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করতে শেখে—এসবের অধিকাংশই সে জন্মের পর সামাজিকীকরণের মাধ্যমে অর্জন করে।
পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবেশ—সবকিছু মিলেই ব্যক্তির চিন্তা ও আচরণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
কার্ল মার্ক্সের বহুল উদ্ধৃত বক্তব্যের মর্মার্থ হলো—মানুষের চেতনা তার সামাজিক অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ মানুষ সমাজের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে না; বরং সমাজের মধ্যেই তার পরিচয়, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির বড় অংশ তৈরি হয়।
দর্শনের ইতিহাসে ‘স্বাধীন ইচ্ছা বনাম নির্ধারণবাদ’ একটি দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক।
সপ্তদশ শতাব্দীর দার্শনিক বারুখ স্পিনোজা একটি বিখ্যাত পাথরের উদাহরণ দিয়েছিলেন। একটি পাথর যদি ওপর থেকে নিচে পড়ার সময় সচেতন হতে পারত, তবে সে হয়তো মনে করত—সে নিজের ইচ্ছাতেই নিচে পড়ছে।
মানুষের অবস্থাও অনেকটা তেমন—এমনটাই নির্ধারণবাদী দর্শনের যুক্তি।
মানুষ নিজের সিদ্ধান্তের কারণগুলো সম্পর্কে যতটুকু জানে, তার চেয়ে অনেক বেশি কারণ হয়তো তার অজান্তেই কাজ করে। সে কারণেই মানুষ নিজের সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে অনুভব করতে পারে, যদিও সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে অসংখ্য পূর্বশর্ত।
তবে এখানেই দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান—কমপ্যাটিবিলিজম—বলে, কারণ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া এবং অর্থপূর্ণ স্বাধীনতা একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত নয়। মানুষ হয়তো পরম অর্থে স্বাধীন নয়, কিন্তু নিজের কারণ, মূল্যবোধ ও বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করার একটি বাস্তব স্বাধীনতা তার থাকতে পারে।
একুশ শতকে এসে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়া আরও সূক্ষ্ম হয়েছে।
স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডাটা-নির্ভর অ্যালগরিদম মানুষের পছন্দ ও আচরণকে অনুমান করতে পারছে। কোন ধরনের ভিডিও আমাদের বেশি সময় ধরে রাখবে, কোন বিজ্ঞাপন আমাদের আকৃষ্ট করবে, কোন সংবাদ আমাদের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে—এসব নির্ধারণে অ্যালগরিদম ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মানুষ মনে করতে পারে, সে নিজের ইচ্ছায় একটি ভিডিও দেখছে বা একটি পণ্য কিনছে। কিন্তু তার আগে হয়তো তার সামনে এমনভাবে অসংখ্য তথ্য সাজানো হয়েছে, যাতে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া তার কাছে বেশি স্বাভাবিক বলে মনে হয়।
এখানেই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি—মানুষকে বাধ্য না করেও তাকে পরিচালিত করা।
প্রশ্নটি এখানেই।
যদি মানুষ জৈবিক তাড়না, অবচেতন মন, সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং প্রযুক্তিগত অ্যালগরিদম দ্বারা প্রভাবিত হয়—তাহলে তার স্বাধীনতা কোথায়?
সম্ভবত উত্তরটি সম্পূর্ণ স্বাধীনতা বা সম্পূর্ণ পরাধীনতার কোনো এক প্রান্তে নেই।
মানুষ হয়তো সব তাড়না থেকে মুক্ত হতে পারে না; কিন্তু সে তার তাড়নাকে চিনতে পারে।
ক্ষুধা আছে—সে জানে।
রাগ এসেছে—সে তা বুঝতে পারে।
লোভ তাকে টানছে—সে উপলব্ধি করতে পারে।
কোনো সামাজিক চাপ তাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে—সে সেটিও শনাক্ত করতে পারে।
অ্যালগরিদম তার মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করছে—সে সচেতন হলে সেটিও বুঝতে পারে।
আর এই সচেতনতাই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।
মানুষ হয়তো তাড়নামুক্ত নয়; কিন্তু তাড়না সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। সে নিজের প্রবৃত্তিকে প্রশ্ন করতে পারে, নিজের অভ্যাসকে বিশ্লেষণ করতে পারে, সামাজিক চাপকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এবং নিজের সিদ্ধান্তের কারণ অনুসন্ধান করতে পারে।
মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন—এ দাবি যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি মানুষ সম্পূর্ণ পরাধীন—এ দাবিও হয়তো অসম্পূর্ণ।
মানুষ প্রকৃতি, জৈবিক প্রবণতা, অবচেতন মন, পরিবার, সমাজ, ইতিহাস, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির অসংখ্য শক্তির মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের পথ খুঁজে নেয়।
তাই হয়তো সত্যটি এমন—
মানুষ কখনও পুরোপুরি আপন ইচ্ছায় চলে না; সে সর্বদাই কোনো না কোনো শক্তির দ্বারা তাড়িত। কিন্তু যে মানুষ নিজের তাড়নাকে চিনতে শেখে, সে-ই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের স্বাধীনতার পরিসর তৈরি করতে পারে।
মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা হয়তো তাড়না থেকে সম্পূর্ণ মুক্তিতে নয়; বরং কোন তাড়না তাকে চালিত করছে—তা বুঝতে পারার ক্ষমতায়।
কারণ মানুষ তাড়নার দাস হতে পারে, কিন্তু তাড়নাকে চিনতে পারা মানুষকে কেবল দাস করে রাখে না।