উপসম্পাদকীয় | পঞ্চখণ্ড আই অনলাইন পোর্টাল
কর্মজীবনে আমরা অনেক মানুষের সঙ্গে কাজ করি। কেউ সহকর্মী হিসেবে পরিচিত হন, কেউ দায়িত্বের প্রয়োজনে কাছে আসেন, আবার কেউ কেউ তাঁদের আচরণ, মেধা ও মূল্যবোধ দিয়ে মনের মধ্যে স্থায়ী একটি জায়গা করে নেন। রূপক দাস আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।
একসময় সে ছিল আমার অফিস ক্লার্ক। একজন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে তার কাজকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। সে ছিল মেধাবী, দায়িত্বশীল ও কর্মনিষ্ঠ। সময়ের নিয়মে আমি অবসর নিয়েছি; রূপক এখনো কর্মরত। আমার কর্মজীবনের অধ্যায় শেষ হলেও তার সঙ্গে সেই দীর্ঘ কর্মসম্পর্কের স্মৃতি এখনো অমলিন।
সম্প্রতি ফেসবুক টাইমলাইনে রূপকের বাবার দেওয়া দশটি উপদেশের কথা জানতে গিয়ে মনে হলো, তার চরিত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের উৎস যেন এই কথাগুলোর মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়।
তখন আরও একবার উপলব্ধি করলাম—
সন্তানের জন্য একজন বাবার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার জমিজমা বা অর্থসম্পদ নয়; নৈতিক শিক্ষা।
রূপকের বাবা তাঁকে যে দশটি কথা শিখিয়েছেন, সেগুলো আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি কথার মধ্যে একটি করে জীবনদর্শন লুকিয়ে আছে।
“শরীর হইলো মহাশয়, যত সইবে ততই সয়।”
জীবনের পথে মানুষ অনেক কষ্ট সহ্য করে। দায়িত্বের প্রয়োজনে নিজেকে নিংড়ে দেয়। কিন্তু শরীরেরও একটি সীমা আছে। তাই কাজের পাশাপাশি নিজের শরীর ও সামর্থ্যের প্রতিও যত্নবান হওয়া জরুরি। এটি শুধু স্বাস্থ্যবিষয়ক কথা নয়; নিজের অস্তিত্বকে সম্মান করার শিক্ষা।
“অন্যের দেওয়া দুধের চাইতে নিজের উপার্জিত পানি অধিক সুস্বাদু।”
এই কথার মধ্যে আত্মমর্যাদার এক অসাধারণ দর্শন রয়েছে। নিজের ঘামে অর্জিত সামান্য সম্পদও অন্যের দয়া বা অনুগ্রহে পাওয়া প্রাচুর্যের চেয়ে মূল্যবান। কারণ নিজের উপার্জনে থাকে স্বাধীনতা, আত্মবিশ্বাস এবং মাথা উঁচু করে বাঁচার আনন্দ।
রূপকের কর্মজীবনে এই আত্মমর্যাদার ছাপ আমি কাছ থেকে দেখেছি।
“অন্যের মাতা-পিতাকে অসম্মান করে নিজের মাতা-পিতাকে সম্মান করা বৃথা। তেমনি অন্যের ধর্মকে আঘাত করে নিজের ধর্ম পালন অধর্ম।”
এটি শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়; এটি প্রকৃত মানবিকতার শিক্ষা। নিজের মা-বাবাকে ভালোবাসব, অথচ অন্যের মা-বাবাকে অসম্মান করব—এটি হতে পারে না। নিজের ধর্মকে ভালোবাসব, কিন্তু অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করব—এটিও নৈতিকতার সঙ্গে যায় না।
নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকা এবং অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানো—এই ভারসাম্যই একজন পরিণত মানুষের পরিচয়।
“শিক্ষকদের জীবনভর সম্মান দিও। সুশিক্ষা অর্জন করতে পারবে।”
একজন শিক্ষক হিসেবে এই কথাটি আমার কাছে বিশেষ অর্থবহ। শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন মানুষকে সম্মান করা নয়; জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
যে মানুষ তার শিক্ষকদের স্মরণ করে, সে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শেখার সুযোগ ধরে রাখতে পারে।
“বয়স মানুষকে বড় করে না। দায়িত্ব পালন মানুষকে বড় করে।”
আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এই কথার সত্যতা অসংখ্যবার দেখেছি। বয়স মানুষের শরীরে যোগ হয়; কিন্তু দায়িত্ববোধ মানুষের চরিত্রে যোগ হয়।
কর্মস্থলে রূপকের দায়িত্বশীলতা আমাকে প্রায়ই এই কথাটি মনে করিয়ে দিয়েছে। একটি দায়িত্ব ছোট হোক কিংবা বড়—সেটি আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
“ধর্মের পথে থাকো। অপরের জিনিসে লিপ্সা ও অপরের ক্ষতি করো না।”
মানুষের চরিত্রের বড় পরীক্ষা হয় প্রলোভনের মুহূর্তে। অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ না করা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং নিজের স্বার্থে অন্যের ক্ষতি না করা—এসবই নৈতিক জীবনের মৌলিক শর্ত। এই শিক্ষা মানুষকে শুধু ধর্মপরায়ণ নয়, দায়িত্বশীল নাগরিকও করে।
“অপরের বিশ্বাস ভঙ্গ করিও না।”
একজন মানুষের দক্ষতার চেয়ে তার বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক সময় বেশি মূল্যবান। বিশ্বাস অর্জন করতে সময় লাগে; ভাঙতে লাগে এক মুহূর্ত। কর্মক্ষেত্রে যার ওপর দায়িত্ব দেওয়া যায়, যার কথার ওপর নির্ভর করা যায়, সে প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় সম্পদ।
রূপকের প্রতি আমার দীর্ঘ কর্মসম্পর্কের আস্থার জায়গাটিও এই মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
“বয়স্ক ও ভালো লোকের কাছে থাকিও। অভিজ্ঞতা ও সুপরামর্শ পাবে।”
জ্ঞান বইয়ে পাওয়া যায়, তথ্য প্রযুক্তি থেকে পাওয়া যায়; কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে। যাঁরা জীবনের বহু পথ অতিক্রম করেছেন, তাঁদের ভুল, সাফল্য ও উপলব্ধি থেকে শিক্ষা নেওয়া একজন তরুণকে অনেক অপ্রয়োজনীয় ভুল থেকে রক্ষা করতে পারে।
একজন বাবার এই উপদেশ তাই প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সংযোগেরও শিক্ষা।
“কাজে কোনো লজ্জা নাই। কাজ ছোট কিংবা বড়ো হউক।”
আমাদের সমাজে পেশার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার প্রবণতা এখনো আছে। অথচ সৎ শ্রমের কোনো ছোট-বড় নেই। কাজের মর্যাদা তার আকারে নয়, সততায়। নিজের হাতে পরিশ্রম করে উপার্জন করা অন্নের মধ্যে যে আত্মমর্যাদা আছে, তা অন্যের অনুগ্রহে পাওয়া বিলাসিতার মধ্যেও অনেক সময় থাকে না।
আর দশটি শিক্ষার মধ্যে সবচেয়ে গভীর এবং হৃদয়স্পর্শী কথাটি—
“আমাকে—পিতা—পাপের অন্ন খাওয়াইও না।”
একজন বাবা সন্তানের কাছে নিজের জন্য কোনো সম্পদ চাননি। চাননি বিলাসিতা কিংবা বড় কোনো উপহার। শুধু বলেছেন—অন্যায় উপার্জনের অন্ন যেন তাঁর মুখে না ওঠে। এই একটি বাক্যের মধ্যে একজন পিতার সমগ্র নৈতিক দর্শন যেন এসে দাঁড়িয়েছে।
সন্তান উপার্জন করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই উপার্জনের পথ যদি অন্যায় হয়, তাহলে সেই অর্থ শুধু একজন মানুষের নয়, পুরো পরিবারের বিবেককে কলুষিত করতে পারে।
তাই বাবার এই শিক্ষা যেন সন্তানের প্রতি শেষ এবং সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা—
উপার্জন করো, কিন্তু এমনভাবে করো যেন তোমার বাবা তোমার উপার্জনের অন্ন খেতে পারেন মাথা উঁচু করে।
এই দশটি কথা জানার পর রূপককে আমার কাছে যেন আরও একটু অন্যভাবে দেখতে ইচ্ছে করে।
একসময় সে ছিল আমার অফিস ক্লার্ক। আমি ছিলাম তার কর্মক্ষেত্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও শিক্ষক। দায়িত্বের প্রয়োজনে তাকে নির্দেশ দিয়েছি, কাজ বুঝিয়ে দিয়েছি, কখনো হয়তো সংশোধনও করেছি। কিন্তু সময়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আজ মনে হয়—আমিও তার কাছ থেকে কিছু শিখেছি। শিখেছি, একটি মানুষের চরিত্রের পেছনে পারিবারিক শিক্ষার ভূমিকা কত গভীর।
রূপকের মেধা তার নিজের অর্জন। কর্মদক্ষতাও তার নিজের। কিন্তু তার মূল্যবোধের ভিত নির্মাণে যে মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি—তিনি তাঁর বাবা।
একজন বাবাকে কাছ থেকে না দেখেও তাঁর সন্তানের আচরণের মধ্য দিয়ে তাঁকে কিছুটা চেনা যায়। রূপক দাসের মধ্যে আমি তাঁর বাবার সেই শিক্ষার ছায়া দেখতে পাই।
আমি অবসর নিয়েছি, রূপক এখনো কর্মরত। কর্মজীবনের পদমর্যাদা আমাদের আর একই জায়গায় রাখে না। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে আমার দৃষ্টিতে মানুষকে মূল্যায়নের মাপকাঠি পদ নয়—চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও সততা। আর সেই জায়গা থেকেই রূপকের বাবার প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জন্মায়।
তিনি হয়তো সন্তানের জন্য বিশাল সম্পদ রেখে যাননি। কিন্তু রেখে গেছেন এমন দশটি বাক্য, যা একটি মানুষের সারাজীবনের নৈতিক কম্পাস হয়ে থাকতে পারে।
আজকের সময়ে আমরা সন্তানকে শেখাই কীভাবে সফল হতে হয়; খুব কমই শেখাই সৎভাবে সফল হতে হয় কীভাবে।
আমরা শেখাই কীভাবে বেশি উপার্জন করতে হয়; কিন্তু কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই উপার্জন যেন কারও অধিকার নষ্ট করে না আসে—তা অনেক সময় ভুলে যাই।
রূপকের বাবা সেই জায়গাতেই আলাদা। তিনি তাঁর সন্তানকে বলেছেন—
নিজেকে সামলাও।
নিজের শ্রমকে সম্মান করো।
মা-বাবাকে সম্মান করো।
অন্যের বিশ্বাসকে মর্যাদা দাও।
শিক্ষককে শ্রদ্ধা করো।
দায়িত্ব পালন করো।
লোভ থেকে দূরে থাকো।
বিশ্বাস রক্ষা করো।
অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে শেখো।
আর সবশেষে—এমন উপার্জন করো, যার অন্ন বাবার মুখে তুলে দিতে তোমার লজ্জা না হয়।
এটাই তো একজন মানুষের প্রকৃত শিক্ষা। এটাই একজন বাবার প্রকৃত উত্তরাধিকার।
আর একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে রূপকের সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে শুধু আমার সাবেক অফিস ক্লার্ক নয়; সে এমন একজন মানুষ, যার চরিত্রে আজও তার বাবার শিক্ষা বেঁচে আছে।
মানুষের মৃত্যুর পর তার সম্পদ উত্তরাধিকারীদের হাতে যায়; কিন্তু তার আদর্শ থেকে যায় মানুষের চরিত্রে।
রূপকের বাবা তাঁর সন্তানের মধ্যে বেঁচে আছেন—তাঁর কথায়, তাঁর আচরণে, তাঁর দায়িত্ববোধে এবং সবচেয়ে বেশি, তাঁর বিবেকের কাছে।
এই উত্তরাধিকারই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। এই উত্তরাধিকারই সবচেয়ে মূল্যবান। আর এই উত্তরাধিকারই একজন বাবার সত্যিকারের জয়।