মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
শিকড়ের টানে আশেক আহমদ আসুক—শিক্ষার অগ্রযাত্রায় অনন্য অবদান যার যোগ্যতা নেই, সে কেন যোগ্যতার আসনে? দুই মামলায় কারাগারে পল্লব: বিয়ানীবাজারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানকে জেলহাজতে পাঠালেন আদালত মানুষ : নিজের কাছেই পরাধীন বিয়ানীবাজারে তালামীযে ইসলামিয়ার ২০২৬-২৭ সেশনের কাউন্সিল সম্পন্ন বাটেরা থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লব: সরাসরি সিলেট আদালতে তোলা হচ্ছে!  বিয়ানীবাজার মডেল মসজিদের দুই প্রস্তাবিত স্থানই গাইডলাইন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে যাচাই হবে: জেলা প্রশাসক চারখাইয়ের আত্মসম্মান বনাম প্রশাসনিক বাস্তবতা—মডেল মসজিদের সিদ্ধান্ত হোক বিয়ানীবাজারের স্বার্থে সিলেটি ভাষাকে অপমান মানে:  বাংলাদেশের বহুত্বকেই অপমান আইন ও ন্যায়ের সংসদীয় অঙ্গনে এমরান আহমদ চৌধুরীর নতুন অধ্যায়

যার যোগ্যতা নেই, সে কেন যোগ্যতার আসনে?

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

✍️ আতাউর রহমান

সমাজে আমরা প্রায়ই একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হই—যার যে যোগ্যতা নেই, সে-ই অনেক সময় সেই যোগ্যতার আসন দখল করে বসে থাকে। আর যার শিক্ষা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত যোগ্যতা রয়েছে, তাকে কখনো কখনো সেই অবস্থানের যথাযথ মূল্য দেওয়া হয় না।

এটি শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি একটি সমাজের মূল্যায়নব্যবস্থা, নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সংকট।

একজন ব্যক্তি রাস্তাঘাটে ফেরি করে বা কেনভাসারি করে ওষুধ বিক্রি করছেন—এটি তার জীবিকার বিষয় হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি যদি নিজেকে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাহলে একজন বিশেষজ্ঞ ডিগ্রিধারী চিকিৎসকের পেশাগত অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? চিকিৎসাবিজ্ঞানের দীর্ঘ অধ্যয়ন, প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার যে মূল্য—তা কি শুধুই একটি সনদে সীমাবদ্ধ?

চিকিৎসা কোনো অনুমানের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিশেষায়িত পেশা। তাই এখানে যোগ্যতার বিকল্প নেই।

একই প্রশ্ন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যে ব্যক্তি সংবাদ, সংবাদমূল্য, তথ্য যাচাই, উৎসের গোপনীয়তা, নৈতিকতা, সম্পাদনা কিংবা সাংবাদিকতার মৌলিক সংজ্ঞাই জানেন না—তিনি যদি কোনো সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় দায়িত্বে বসেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক: পদটি কি যোগ্যতার কারণে, নাকি অন্য কোনো কারণে?

সম্পাদক হওয়া শুধু একটি পদবি ধারণ করা নয়। একজন সম্পাদককে জানতে হয়—কোনটি সংবাদ, কোনটি মতামত, কোনটি প্রচারণা, কোনটি অপপ্রচার এবং কোনটি জনস্বার্থের বিষয়। তাকে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে হয়, ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা করতে হয় এবং একই সঙ্গে পাঠকের আস্থা ও গণমাধ্যমের মর্যাদা রক্ষা করতে হয়।

পদবির সঙ্গে দায়িত্বেরও একটি যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়।

একজন ব্যক্তি ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেননি—এটি ব্যক্তিগত জীবনে তার সীমাবদ্ধতা হতে পারে। কিন্তু কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি, নীতিনির্ধারণী কাঠামো বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—সেই দায়িত্ব পালনের জন্য তার প্রয়োজনীয় জ্ঞান, শিক্ষা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও দূরদৃষ্টি আছে কি না?

কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কোনো সামাজিক মর্যাদার আসন নয়; এটি প্রজন্ম গঠনের দায়িত্ব।

আর সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, যখন একজন শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষক নিজেই সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে শিক্ষার্থীদের ওপর গাইড বই চাপিয়ে দেন এবং সেটিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়।

একজন প্রধান শিক্ষক যদি শিক্ষাকে ব্যবসার পণ্যে পরিণত করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা তার কাছ থেকে কী শিখবে?

শিক্ষকের প্রথম পরিচয় ব্যবসায়ী নয়—তিনি শিক্ষার অভিভাবক।

একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষের বাইরেও নৈতিকতার উদাহরণ তৈরি করেন, তখন শিক্ষার্থীরা শিক্ষা পায়। আর যখন শিক্ষার নামে বাণিজ্য চলে, তখন বইয়ের পাতায় যত নৈতিক শিক্ষা থাকুক, বাস্তব জীবনের আচরণই শিক্ষার্থীর কাছে বড় হয়ে ওঠে।

এখানেই আমাদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজন।

আমরা কি সত্যিই যোগ্যতাকে মূল্য দিচ্ছি?

নাকি পদ, পরিচয়, অর্থ, প্রভাব, রাজনৈতিক যোগাযোগ কিংবা সামাজিক বাহাদুরিকে যোগ্যতার বিকল্প বানিয়ে ফেলছি?

আজ সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে বছরের পর বছর অধ্যয়ন, শ্রম ও সাধনার মাধ্যমে যোগ্যতা অর্জন করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এমন অনেকেই আছেন, যারা যোগ্যতার চেয়ে পদবিকে বড় করে দেখেন। এতে সমস্যা হলো—আমরাও অনেক সময় তাদের সেই সুযোগ করে দিই।

কেউ একটি পদে বসেছে বলেই সে যোগ্য—এমন ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

পদ যোগ্যতার প্রমাণ নয়; দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাই যোগ্যতার প্রমাণ। একজন ডাক্তারকে চিকিৎসাজ্ঞান দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। একজন সাংবাদিককে তথ্যনিষ্ঠতা ও পেশাগত দক্ষতা দিয়ে। একজন সম্পাদককে সম্পাদনার যোগ্যতা ও নৈতিকতা দিয়ে। একজন শিক্ষাপ্রশাসককে শিক্ষা ও প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে। একজন জনপ্রতিনিধিকে জনসেবা ও জবাবদিহিতা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে—যে আসনে যে যোগ্যতা প্রয়োজন, সেখানে সেই যোগ্যতার মানুষকেই বসাতে হবে। কারণ অযোগ্য মানুষ যখন যোগ্যতার আসন দখল করে, তখন ক্ষতিটা শুধু তার নিজের হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো প্রতিষ্ঠান, পেশা এবং শেষ পর্যন্ত সমাজ।

আজ যদি আমরা চিকিৎসাকে অযোগ্য হাতে তুলে দিই, ক্ষতিগ্রস্ত হবে রোগী। সাংবাদিকতাকে অদক্ষ হাতে তুলে দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সত্য ও জনমত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অদক্ষ হাতে দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। প্রশাসন ও নেতৃত্বে অযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা পেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনস্বার্থ। তাই সময় এসেছে ব্যক্তিকে নয়, যোগ্যতাকে মূল্য দেওয়ার।

কারও বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, কারও পেশা বা শিক্ষাগত অবস্থানকে হেয় করাও নয়। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—যে দায়িত্বটি আমি গ্রহণ করছি, সেটি পালনের জন্য আমি কি সত্যিই যোগ্য? এই প্রশ্নটি প্রত্যেকের নিজের কাছে করা দরকার।

কারণ সমাজ তখনই এগিয়ে যায়, যখন যোগ্যতা সম্মানিত হয়, অযোগ্যতা নিরুৎসাহিত হয় এবং দায়িত্বের সঙ্গে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

আমরা যদি যোগ্যতার জায়গায় পরিচয়কে, দক্ষতার জায়গায় প্রভাবকে এবং নৈতিকতার জায়গায় স্বার্থকে বসিয়ে দিই—তাহলে প্রতিষ্ঠান থাকবে, পদ থাকবে, সাইনবোর্ড থাকবে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রাণ থাকবে না।

সুতরাং আসুন, একটি নতুন সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলি—

পদ নয়, যোগ্যতার মূল্যায়ন হোক। পরিচয় নয়, দক্ষতার স্বীকৃতি হোক। প্রভাব নয়, নৈতিকতার জয় হোক। আর দায়িত্বের প্রতিটি আসনে বসুক সেই মানুষ, যিনি সত্যিই সেই দায়িত্ব পালনের যোগ্য।

কারণ অযোগ্য মানুষের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব শুধু একটি ভুল নিয়োগ নয়—এটি একটি প্রজন্মের প্রতি অন্যায়।

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews