
বিশেষ প্রতিবেদক, পঞ্চখণ্ড আই | বিয়ানীবাজার :
বিয়ানীবাজারের শাহজালাল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ঘিরে সৃষ্ট আমানত সংকটের ঘটনায় প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান মিন্টু প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে সমিতির চলমান সংকটের জন্য মাঠ পর্যায়ে বিতরণ করা ঋণের অর্থ আটকে যাওয়া, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতাকে দায়ী করেছেন।
তবে তার বক্তব্যে সংকটের কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও আমানতকারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর মেলেনি। বিশেষ করে—কত টাকার আমানত বর্তমানে আটকে রয়েছে, কত টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে, কতজন সদস্য তাদের পাওনা ফেরত পাননি এবং কখন নাগাদ অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে—এসব বিষয়ে কোনো সময়বদ্ধ রূপরেখা তিনি দেননি।
মিন্টুর বক্তব্যে যা বলা হয়েছে
লিখিত বক্তব্যে আব্দুল মান্নান মিন্টু দাবি করেন, ২০১৪ সাল থেকে সমিতিটি সমবায় আইন ও বিধিমালা মেনে পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সমিতিটি বিয়ানীবাজার উপজেলার শ্রেষ্ঠ সমবায় সমিতি এবং ২০২২ সালে সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ মাইক্রোক্রেডিট সমবায় সমিতির স্বীকৃতি লাভ করে।
তার দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় সব সদস্য তাদের সঞ্চয়ের অর্থ উত্তোলনের জন্য সমিতিতে আসেন। অন্যদিকে, মাঠ পর্যায়ে যাদের কাছে ঋণের অর্থ রয়েছে, তাদের অনেকেই তা পরিশোধ করেননি। ফলে সমিতির অর্থের বড় একটি অংশ আটকে যাওয়ায় তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত ১২ জুলাই শতাধিক সদস্যের অংশগ্রহণে একটি ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভায় তিনি সদস্যদের ধৈর্য ধারণ এবং সমিতির কার্যক্রম সচল রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় সমিতির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি
মিন্টুর বক্তব্যে সমিতির অতীত অর্জন, বর্তমান সংকটের কারণ এবং সদস্যদের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান থাকলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তরহীন রয়ে গেছে।
★ সমিতিতে বর্তমানে মোট কত টাকার আমানত রয়েছে?
★ কতজন সদস্য তাদের সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত পাননি?
★ মাঠ পর্যায়ে কত টাকার ঋণ আদায়যোগ্য রয়েছে?
★ সমিতির ব্যাংক হিসাবগুলোতে বর্তমানে কী পরিমাণ অর্থ রয়েছে?
★ ঋণ আদায়ে কী ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
★ ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যদের অর্থ ফেরতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি বা রোডম্যাপ রয়েছে কি?
★ সমিতির সর্বশেষ নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদন কী বলছে?
অনুসন্ধানী বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে এটি কেবল একটি সাময়িক তারল্য সংকট, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো আর্থিক অনিয়ম রয়েছে।
আমানতকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কেউ প্রবাসজীবনের সঞ্চয়, কেউ জমি বিক্রির অর্থ, আবার কেউবা জীবনভর জমানো টাকা সমিতিতে আমানত হিসেবে রেখেছেন। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অর্থ ফেরত না পাওয়ায় অনেক পরিবার এখন আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
তাদের প্রশ্ন, যদি সমিতির অর্থ মাঠ পর্যায়ে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই ঋণ আদায়ে এত দীর্ঘ সময়েও কার্যকর অগ্রগতি কেন দৃশ্যমান নয়? আর যদি আদায় প্রক্রিয়া চলমান থাকে, তাহলে সদস্যদের জন্য পর্যায়ক্রমিক অর্থ ফেরতের কোনো পরিকল্পনা এখনো ঘোষণা করা হয়নি কেন?
সংকটের সমাধান কোথায়?
আর্থিক ও সমবায় খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের টেকসই সমাধানে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি—
★ সমিতির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও ফরেনসিক নিরীক্ষা;
★ সদস্যদের পাওনা অর্থ পরিশোধের সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ;
★ মাঠ পর্যায়ের ঋণ আদায় এবং সমিতির সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব জনসম্মুখে উপস্থাপন।
তাদের মতে, অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, শত শত বা হাজারো সদস্যের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
শেষ কথা
শাহজালাল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতিকে ঘিরে চলমান এই সংকট এখন শুধু একটি মামলা বা একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি সমবায় ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের নিরাপত্তার প্রশ্নও বটে।
আব্দুল মান্নান মিন্টুর বক্তব্যে সংকট উত্তরণের আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভুক্তভোগীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা চাইছেন। এই দুই অবস্থানের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তথ্যভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
এখন সবার একটাই প্রশ্ন—হাজারো আমানতকারীর সঞ্চয়ের অর্থ ফিরবে কবে?