
এইচএসসি প্রস্তুতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব
পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক:
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন লোডশেডিং ও অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরমের মধ্যে দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন অসংখ্য গ্রাহক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার কোথাও টানা দুই ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ারও কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে। অনেকের ভাষায়, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখন যেন ‘ভানুমতীর খেলা’।
এদিকে, আগামী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সামনে রেখে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। সন্ধ্যা ও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা থেকে শুক্রবার রাত প্রায় ৮টা পর্যন্ত লাসাইতলা হাওর এলাকায় বিদ্যুতের একটি খুঁটি ভেঙে পড়ায় উপজেলার প্রায় আড়াই হাজার গ্রাহক টানা বিদ্যুৎবিহীন ছিলেন। দীর্ঘ এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কার্যত স্থবিরতা নেমে আসে।
খাসা এলাকার এক গৃহিণী বলেন, “সারা দিনে কতবার বিদ্যুৎ যায়, তার হিসাব নেই। গত দুই সপ্তাহ ধরে শুধু রাতেই ৬-৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে শিশুরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না।”
কুড়ারবাজার এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, “এমন লোডশেডিং আগে কখনো দেখিনি। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। ঘন ঘন ট্রিপ করায় ফ্রিজ, কম্পিউটারসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
ব্যবসায়ীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে দোকানপাট, কোল্ড স্টোরেজ, কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রনির্ভর ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফারুক হোসেন নামে এক গ্রাহক মন্তব্য করেন, “যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনেই ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নতুন গ্রাহকসংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন কী ছিল?”
এ বিষয়ে বিয়ানীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুপন মিয়া জানান, উপজেলায় দৈনিক প্রায় ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিয়ানীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক পার্থ চক্রবর্তী বলেন, “চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ কম থাকায় লোডশেডিং এড়ানোর সুযোগ নেই।”
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন ঘাটতি, অতিরিক্ত চাহিদা, গ্রীষ্মকালীন চাপ এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, বিয়ানীবাজারবাসীর দাবি, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য সময়সূচি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে জনসাধারণকে অবহিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তীব্র গরমের সঙ্গে দীর্ঘ লোডশেডিং যুক্ত হয়ে জনজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি এবং পরীক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তাই দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা এখন বিয়ানীবাজারবাসীর অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা।