শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
১০ আগস্ট এসএসসির ফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা ঘুষখোরের শাসন ও লুটেরার রাজত্ব: নাগরিক কি শুধু দর্শক? ইউপি নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি: গুজবের আড়ালে কী বলছে আইন ‘৫ আগস্ট গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিন, বিজয়ের দিন’ — প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাইয়ের দুই বছর: প্রত্যাশা, প্রাপ্তি নাকি অপূর্ণতার হিসাব? বিয়ানীবাজার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০০ শয্যার নতুন ভবনের প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করলেন এমপি এমরান চৌধুরীর দুই দশক ধরে মৃত শিক্ষকের পরিচয়ে সরকারি বেতন উত্তোলনের অভিযোগ: তদন্তের মুখে জামায়াত নেতা আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম : পঞ্চখণ্ডের গর্ব, ইতিহাসের আলোকবর্তিকা গুণীজনদের স্মরণে বিয়ানীবাজার সোস্যাল অর্গেনাইজেশনের ভাবগম্ভীর স্মরণসভা ইতিহাসের মুখোমুখি: আগস্টের আয়নায় বাংলাদেশ

সিলেটের প্রাথমিক শিক্ষা টালমাটাল : ১২ উপজেলায় ২০০’র বেশি শিক্ষক বিদেশে ও দেড় হাজার পদ শূন্য

  • প্রকাশিত: সোমবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৮৮ বার পড়া হয়েছে

পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক :

সিলেট জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এক ভয়াবহ বাস্তবতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে— শিক্ষক আছেন, কিন্তু স্কুলে নেই। মাসের পর মাস ছুটি না নিয়েই অনেকে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। পরিবার নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার এই প্রবণতা এখন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, ফলে জেলার প্রায় সব উপজেলার বিদ্যালয়েই তীব্র শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। এই অনুপস্থিতির ফলে পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

২১ মাসে বিভাগীয় ব্যবস্থা ১৬৩ জনের বিরুদ্ধে

সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট ১৬৩ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪০ জনের মামলা নিষ্পত্তি হয়ে অধিকাংশকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকিদের মামলা এখনও চলমান রয়েছে। অফিস সূত্র আরও জানায়, শিক্ষকরা চাকরি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করে বিদেশে চলে যাওয়ায় পদ শূন্যতা পূরণের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ছে এবং শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলাভিত্তিক অনুপস্থিতির চিত্র

প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ২১ মাসের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ দিনের বেশি অনুপস্থিত শিক্ষকের উপজেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়— বিশ্বনাথে ২৪ জন, বিয়ানীবাজারে ২০ জন, সিলেট সদরে ১৬ জন, বালাগঞ্জে ১১ জন, গোলাপগঞ্জে ১২ জন, ফেঞ্চুগঞ্জে ৪ জন, জকিগঞ্জে ১৬ জন, কানাইঘাটে ৭ জন, জৈন্তাপুরে ৪ জন, গোয়াইনঘাটে ১০ জন, দক্ষিণ সুরমায় ১৮ জন, ওসমানীনগরে ২০ জন এবং কোম্পানীগঞ্জে ১ জন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন। এই তথ্য স্পষ্ট করে যে প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই শিক্ষক সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে।

দেড় হাজারের বেশি পদ শূন্য

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পরিচালক শাখাওয়াত এরশেদ বলেন, ছুটি ছাড়া ৬০ দিনের বেশি অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ ধরনের অভিযোগে ১৬৩ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, চাকরিচ্যুত করা গেলেও জরিমানা করার কোনো বিধান নেই। বর্তমানে সিলেট জেলায় প্রধান শিক্ষকের ৭৮৮টি ও সহকারী শিক্ষকের ৭৫০টি পদ শূন্য রয়েছে, যা এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

‘চাকরি না ছেড়েই প্রবাসে’—নতুন প্রবণতা

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অনেক শিক্ষক চাকরি থেকে ইস্তফা না দিয়েই ভ্রমণ বা কাজের ভিসায় পরিবারসহ বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে পদ খালি দেখানো যাচ্ছে না, যার কারণে নতুন শিক্ষক নিয়োগেও দেরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় পেশা ছেড়ে বিদেশে

শিক্ষাবিদদের মতে, এই বিদেশমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পেশাগত অনুপ্রেরণার অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাহীনতার কারণে। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন, “সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে তুলনা করলে তা যথেষ্ট নয়। তাই অনেকেই সুযোগ পেলেই বিদেশে চলে যাচ্ছেন ভবিষ্যৎ সুরক্ষার আশায়।”

আলোহীন পাঠশালার সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ

বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষকদের এই ধারাবাহিকতা যদি বন্ধ না হয়, তবে জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা মারাত্মক সংকটে পড়বে। একদিকে শিক্ষক সংকট, অন্যদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার জটিলতা—এই দুইয়ের ফাঁদে পড়ে শিক্ষা কার্যক্রম ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিক্ষকহীন স্কুল মানে আলোহীন পাঠশালা। এই প্রবণতা রোধে সরকার, প্রশাসন ও সমাজ—সবারই দায়িত্বশীল ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews