
খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিয়ানীবাজার:
প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬-এ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্বাচিত হওয়ায় সিলেটের বিয়ানীবাজারের ঐতিহ্যবাহী খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেছেন, “খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ অর্জন বিয়ানীবাজারবাসীর জন্য গর্বের। এই স্বীকৃতি অর্জনে বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাই। একইসঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, “ক্ষুদে শিশুদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করুন। তাদের হাতে বই তুলে দিন, কারণ বই-ই মানুষ গড়ে।” এ সময় তিনি বিয়ানীবাজারের শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে একাধিক ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বিয়ানীবাজার উপজেলাকে মিডডে মিল কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ড্রেস, জুতা ও স্কুলব্যাগ বিতরণ করা হবে। এ বছর থেকে মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ চালু হবে এবং ২১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে।
এছাড়া খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের জন্য রেস্টরুম, প্রধান ফটক ও শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি। প্রবাসীবহুল বিয়ানীবাজারে “প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক” স্থাপন এবং ছয় লেন সড়কের কাজ দ্রুত শুরু করার বিষয়েও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, “আমি আপনাদের দোয়া চাই। আপনাদের খাদেম হিসেবে আপনাদের মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই।”
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমদ রেজা, বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মো. মাহফুজুল কবির, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নৃপেন্দ্র নাথ সরকার, বিয়ানীবাজার আদর্শ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. মজিবুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, কলামিস্ট আতাউর রহমান এবং সিলেট জেলা বিএনপির শিশু বিষয়ক সম্পাদক সিদ্দিক আহমদ।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পারভেজ তালুকদার, পিটিএ সভাপতি ছরওয়ার হোসেন, অভিভাবক প্রতিনিধি হোসাইন আহমেদ, খাসা সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি হুমায়ুন কবীর আকিল, প্রাক্তন শিক্ষার্থী রায়হান আলম সাজু, ৪নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম এবং আল ইসলাহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান লুৎফুর রহমান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও কলামিস্ট মোঃ আতাউর রহমান বলেন, “আজকের এই দিনটি শুধু খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য নয়, সমগ্র বিয়ানীবাজারবাসীর জন্য এক গৌরবের দিন। একটি বিদ্যালয়ের পদক অর্জনের মধ্য দিয়ে একটি জনপদের স্বপ্ন ও শিক্ষার প্রতি মানুষের ভালোবাসা জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “যে বিদ্যালয়ে শিশুরা বই পড়ে, বিতর্ক করে, গান গায় ও পুতুল নাচে অংশ নেয়—সেই বিদ্যালয়ই প্রকৃত অর্থে আলোকিত মানুষ তৈরির কারখানা। ‘আমরা নতুন, আমরা কুঁড়ি’—এ শুধু একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নয়; এটি আগামী দিনের বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ।”
স্বাগত বক্তব্যে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফসা বেগম বলেন, “এই পুরস্কার আমার একার নয়; এটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি এবং সমগ্র এলাকার মানুষের সম্মিলিত অর্জন। আমি খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একটি ‘সবুজ বিদ্যালয়’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “দুঃখের বিষয়, ১২৯ বছরের পুরোনো এ বিদ্যালয়ের নামে এখনো কোনো মালিকানাধীন জমি নেই। বিদ্যালয়ের ভূমি খতিয়ানভুক্ত করা সময়ের দাবি।” এ সময় তিনি বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক বিধু ভূষণ বৈদ্যের দীর্ঘ ২৮ বছরের অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং স্থানীয়, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সহযোগিতাকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাও তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেন তানজিদ আহমেদ এবং গীতা পাঠ করেন বৃষ্টি রাণী দাস। এরপর শিক্ষার্থীরা “আমরা নতুন, আমরা কুঁড়ি” শীর্ষক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করে। একক অভিনয়ে অংশ নেয় শ্রাবণী কর। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল—“বই পড়া মোবাইল ব্যবহারের চেয়ে বেশি উপকারী”। এছাড়া দলীয় সংগীত ও পুতুল নাচ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব সম্পন্ন হয়।
প্রধান অতিথির উদ্দেশে মানপত্র পাঠ করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রিমা বেগম। অনুষ্ঠান দুটির সঞ্চালনা করেন খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তন্ময় পাল।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি মো. গিয়াস উদ্দিন, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুছ সবুর, উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার এখলাছ মিয়া, জেলা বিএনপির সহ স্থানীয় বিষয়ক সম্পাদক এনাম উদ্দিন, শ্রীধরা জনমঙ্গল সমিতির সেক্রেটারি গুলজার আহমদ রাহেলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
উল্লেখ্য, ১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩১৪ জন শিক্ষার্থী, শতভাগ পাসের হার, ট্যালেন্টপুলে সাতটি বৃত্তি, সাতজন শাপলা কাব এবং বহুমাত্রিক সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ অর্জন করে বিয়ানীবাজারের জন্য অনন্য গৌরব বয়ে এনেছে।