মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ০৫:৩০ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
মাজারে দান: বিশ্বাস, বাণিজ্য ও জনসচেতনতার প্রশ্ন ২৩ জুন ঘিরে বিয়ানীবাজারে টানটান সতর্কতা, মাঠে বিএনপি- পুলিশ প্রশাসন প্রশাসনের বদলি বার্তা: জনমতের বহু প্রশ্ন সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার আজ বিশ্ব বাবা দিবস পালিত হচ্ছে গ্রামীণ সমিতি ও ক্লাব: উন্নয়নের হাতিয়ার নাকি ক্ষমতার বলয় ? বিয়ানীবাজারের বর্ষীয়ান জননেতা হাজী আব্দুল হাসিব মনিয়া আর নেই কাঁঠালের ঘ্রাণে ভরপুর সুস্বাদু হালুয়া: ঘরেই তৈরি করুন সহজে সিলেটে নিষিদ্ধ সংগঠনের ঝটিকা বিক্ষোভের জেরে সন্ত্রাসবিরোধী মামলা, গ্রেফতার ৬ : অভিযান অব্যাহত গোলাপগঞ্জে ঝোঁপ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক উদ্ধার

মাজারে দান: বিশ্বাস, বাণিজ্য ও জনসচেতনতার প্রশ্ন

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে

শমশের আলম
বাংলাদেশের সমাজে মাজার সংস্কৃতি একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ। ধর্মীয় অনুভূতি, আধ্যাত্মিক অনুরাগ কিংবা ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে মানুষ যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন মাজার জিয়ারত করে আসছেন। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের এই চর্চা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে মাজারকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, দান-অনুদান নির্ভর বাণিজ্য এবং কিছু অসাধু চক্রের প্রভাব বিস্তার সমাজে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রশ্নটি সরল—মাজারে অর্থ দিলে কী হয়, আর না দিলে কী হয়?

বাস্তবতা হলো, মাজারে দেওয়া অর্থ সরাসরি কোনো অলৌকিক মাধ্যমে কবরে শায়িত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই অর্থ ব্যবহৃত হয় মাজার পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে। কিন্তু যখন এই অর্থ ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছতার বাইরে চলে যায়, তখন তা ধর্মীয় অনুশীলনের পরিবর্তে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে রূপ নিতে পারে। আর সেখানেই সৃষ্টি হয় উদ্বেগের।

আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা রোগমুক্তি, সন্তান লাভ, ব্যবসায়িক উন্নতি কিংবা ব্যক্তিগত সংকট থেকে মুক্তির আশায় মাজারে গিয়ে মানত করেন বা অর্থ দান করেন। তাদের বড় একটি অংশ শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী। জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত এসব মানুষ অনেক সময় বাস্তব সমাধানের পরিবর্তে অলৌকিক প্রত্যাশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যক্তি মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসকে ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা আদায় করে থাকে।

অন্যদিকে সমাজের আরেকটি শ্রেণী রয়েছে, যারা ধর্মীয় আবেগের চেয়ে মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক মর্যাদা বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা থেকে বড় অঙ্কের অনুদান দিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই অর্থের কতটুকু জনকল্যাণে ব্যয় হয় এবং কতটুকু ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হয়?

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। ইসলাম মানুষকে একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে, তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে এবং দান-সদকাকে মানবকল্যাণে ব্যয় করতে উৎসাহিত করে। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে দান-সদকার মূল উদ্দেশ্য হলো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে আহার দেওয়া, এতিমের মুখে হাসি ফোটানো এবং সমাজে ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।

এ কারণে মাজারে অর্থ প্রদানের পরিবর্তে যদি সেই অর্থ কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষাব্যয়ে, কোনো রোগীর চিকিৎসায়, কোনো এতিমখানার উন্নয়নে বা অসহায় পরিবারের সহায়তায় ব্যয় করা হয়, তবে তার সামাজিক উপকারিতা অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়। এতে যেমন মানবকল্যাণ সাধিত হয়, তেমনি দানের প্রকৃত উদ্দেশ্যও বাস্তবায়িত হয়।

তবে এই আলোচনায় ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। দেশের সব মাজার বা সব খাদেমকে একই দৃষ্টিতে দেখা ন্যায়সংগত হবে না। কিছু ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখছে। কিন্তু যেখানে অস্বচ্ছতা, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অলৌকিকতার নামে ব্যবসা কিংবা মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনের প্রবণতা দেখা যায়, সেখানে অবশ্যই সামাজিক সচেতনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

আজ প্রয়োজন মাজারবিরোধী বা মাজারপন্থী বিভাজন নয়; প্রয়োজন যুক্তিবোধ, ধর্মীয় জ্ঞান এবং জনসচেতনতা। মানুষকে বুঝতে হবে, কোনো ব্যক্তি—জীবিত বা মৃত—নিজস্ব ক্ষমতায় মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন না। মানুষের কল্যাণ, অকল্যাণ এবং জীবনের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টিকর্তার হাতে।

অতএব, বিশ্বাস থাকুক হৃদয়ে, শ্রদ্ধা থাকুক ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের প্রতি; কিন্তু দান-অনুদান হোক সচেতন, স্বচ্ছ ও মানবকল্যাণমুখী। অন্ধবিশ্বাস নয়, জ্ঞানভিত্তিক ধর্মচর্চা এবং দায়িত্বশীল সামাজিক মানসিকতাই পারে ধর্মের নামে গড়ে ওঠা অনিয়ম ও অর্থবাণিজ্যের পথ রুদ্ধ করতে।

সমাজকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন বিবেকের ব্যবহার। কারণ প্রকৃত ধর্ম মানুষকে বিভ্রান্ত করে না; বরং সচেতন, মানবিক এবং দায়িত্বশীল হতে শেখায়।

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews