
সম্প্রতি আমার মা ইন্তেকাল করেছেন। গতকাল (১৩ জুন) সকাল ১১টায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আমার গ্রাম শ্রীধরা এবং বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। যদিও জানাজার সময় মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল, তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়েনি। যদি প্রবল বৃষ্টি হতো, তাহলে শত শত মানুষ কোথায় দাঁড়িয়ে জানাজা আদায় করতেন?
এ প্রশ্ন শুধু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নয়; এটি আমাদের গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারের বাস্তবতা।
গ্রামীণ বাংলাদেশে মানুষের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও ধর্মীয় অনুভূতির একটি অংশ হলো শেষ বিদায় বা জানাজা। অথচ আধুনিকতার এই যুগেও দেশের বহু গ্রামে রোদ-বৃষ্টি কিংবা বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে খোলা মাঠে বা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে জানাজা পড়তে হয়। জানাজার জন্য আলাদা শেড কিংবা স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এই ভোগান্তি নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি সামর্থ্যের অভাব, নাকি অবহেলা?
আমার দৃষ্টিতে, এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রয়েছে আমাদের উদাসীনতা।
অনেক গ্রামেই জায়গার সংকট প্রকট। জানাজার জন্য আলাদা স্থায়ী শেড বা জানাজাগাহ নির্মাণের মতো পর্যাপ্ত খাস জমি বা ওয়াকফকৃত জমি পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা স্থানীয় সরকারের সীমিত বাজেট সাধারণত রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার মতো জরুরি খাতে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে মৃত্যুর পর মানুষের শেষ বিদায়ের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান পায় না।
আবার অনেকে মনে করেন, মসজিদেই জানাজা পড়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ গ্রামের মসজিদ ছোট বা মাঝারি আকারের। পুরো গ্রামের মানুষ যখন জানাজায় অংশ নেন, তখন মসজিদের ভেতরে সবাইকে স্থান দেওয়া সম্ভব হয় না।
তবে সমস্যার সব দায় অপরাগতার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াও সঠিক হবে না। কারণ সদিচ্ছা ও দূরদর্শিতা থাকলে এর সমাধান অসম্ভব নয়।
আমরা প্রায়ই দেখি, মসজিদের মূল ভবন সম্প্রসারণ, মার্বেল পাথর স্থাপন কিংবা সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। অথচ বৈরী আবহাওয়ায় জানাজার জন্য একটি সাধারণ টিনশেড, কিংবা সহজে স্থাপনযোগ্য বড় শামিয়ানার ব্যবস্থা করার বিষয়টি আমাদের চিন্তায় আসে না।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও নির্বাচনের সময় নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও, মানুষের শেষ বিদায়ের এই কষ্টের জায়গাটি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে দেখা যায় না।
আরও একটি বড় কারণ আমাদের মানসিকতা। “বাপ-দাদারাও তো খোলা মাঠে জানাজা দিয়েছেন, একটু রোদ-বৃষ্টিতে ভিজলে কী হবে”—এ ধরনের চিন্তাভাবনা আমাদের প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে রাখে।
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে খোলা মাঠে জানাজা আদায় করা সুন্নাহসম্মত। তবে তীব্র রোদ, বৃষ্টি কিংবা কাদামাটির মতো পরিস্থিতিতে মসজিদে বা শেডের নিচে জানাজা পড়ার ক্ষেত্রেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং ব্যবহারিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ঝড়-বৃষ্টির দিনে লাশের খাটিয়া নিয়ে আশ্রয় খোঁজার পরিস্থিতি জীবিতদের জন্য যেমন কষ্টকর, তেমনি মৃত ব্যক্তির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সবকিছু বিবেচনায় এটি পুরোপুরি অপরাগতা নয়, আবার সম্পূর্ণ অবহেলাও নয়। জমি ও প্রাথমিক অর্থের অভাব যদি অপরাগতা হয়ে থাকে, তবে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে বছরের পর বছর ফেলে রাখা নিঃসন্দেহে অবহেলা।
খুব বড় স্থায়ী শেড নির্মাণ সম্ভব না হলেও, প্রতিটি গ্রামীণ মসজিদ কমিটি যদি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার জন্য কয়েকটি বড় ওয়াটারপ্রুফ ত্রিপল বা পোর্টেবল শামিয়ানা সংরক্ষণ করে রাখে, তাহলে অতি সামান্য ব্যয়েই এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটানো সম্ভব।
প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, সদিচ্ছা এবং কিছুটা দূরদর্শিতা।
মৃত্যু আমাদের সবার জন্য অনিবার্য সত্য। তাই শেষ বিদায়ের মুহূর্তটুকুকে মর্যাদাপূর্ণ ও কষ্টমুক্ত করার দায়িত্বও আমাদের সবার।
এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এই বাস্তব প্রয়োজনটি উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব, নাকি পরবর্তী কোনো জানাজায় একই কষ্টের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখব?
সূত্র: লেখকের ফেসবুক টাইমলাইনে থেকে।