
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাভিত্তি। বিশেষ করে দরিদ্র ও অবহেলিত এলাকার শিশুদের ধর্মীয়, নৈতিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। অথচ বিয়ানীবাজার উপজেলায় চলতি শিক্ষাবর্ষে ৯টি শিক্ষাকেন্দ্রের প্রায় ২৭০ জন শিক্ষার্থী পাঠ্যবই না পাওয়ায় কার্যত শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে—যা উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অজুহাতে এসব শিশুদের পাঠ্যবই থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তথ্য অনুযায়ী, ইউএনও কর্তৃক সত্যায়িত শিক্ষার্থী তালিকা, ছবি ও প্রয়োজনীয় নথি যথাযথভাবে দাখিল করা হলেও একটি বাছাই কমিটির সিদ্ধান্তে কেন্দ্রগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়। প্রশ্ন হলো—যেখানে শিশুদের অস্তিত্ব, উপস্থিতি ও শিক্ষাগ্রহণের প্রমাণ রয়েছে, সেখানে কেবল প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া কি ন্যায়সংগত?
ফিল্ড সুপারভাইজারের বক্তব্যে দেখা যায়, কোনো কোনো কেন্দ্রে দায়িত্বশীলের অনুপস্থিতি, কোথাও শিক্ষার্থী সংখ্যা কম, আবার কোথাও শিক্ষকের সনদসংক্রান্ত জটিলতা ছিল। এসব সমস্যা থাকলে তা প্রশাসনিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই যৌক্তিক ছিল। কিন্তু সমস্যার দায় সরাসরি শিশুদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বই বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোনো অনিয়ম থাকলে তার দায় শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের নয়—এ সত্যটি ভুলে গেলে চলবে না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—বইবঞ্চিত শিশুদের বিকল্প হিসেবে পাশ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানে পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাস্তবতায় এটি কতটা কার্যকর বা মানবিক, তা সহজেই অনুমেয়। স্থান, সামাজিক পরিবেশ ও আর্থিক বাস্তবতার কারণে সব শিশুর পক্ষে অন্য কেন্দ্রে স্থানান্তর হওয়া সম্ভব নয়। ফলে এই সিদ্ধান্ত শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতায় সরাসরি আঘাত হানছে।
বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া চলতেই পারে, কিন্তু সেই সময় পর্যন্ত অন্তত পাঠ্যবই সরবরাহ অব্যাহত রাখা ছিল ন্যূনতম দায়িত্ব। তা না করে শিশুদের শিক্ষা স্থবির করে দেওয়া রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি—ইউএনও কর্তৃক সত্যায়িত নথির ভিত্তিতে অবিলম্বে বই বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্র বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক ও আইনগত ভিত্তি জনসম্মুখে স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা না থাকলে তা শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, ভবিষ্যতে আরও বৈষম্যের পথ খুলে দেয়।
শিশুরা কোনো নীতিনির্ধারণের অংশ নয়, তারা তার ভুক্তভোগী। প্রশাসনিক জটিলতার বলি হয়ে যেন আর কোনো শিশুর হাতে খাতা-কলমের বদলে হতাশা তুলে দিতে না হয়—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার।