Eng
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিস্তারে শ্রমবাজারে সংকট

প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪:১৭ অপরাহ্ণ



কৃষি ও নির্মাণ খাতে শ্রমিক সংকট, মফস্বল শহরে যানজট-দুর্ঘটনাও বাড়ছে

শমসের আলম, অনুসন্ধানী প্রতিবেদক :

দেশের মফস্বল ও উপশহরাঞ্চলে গত কয়েক বছরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। স্বল্প দূরত্বে সহজ ও তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ বাহন। একই সঙ্গে অনেক বেকার ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে দ্রুত আয়ের একটি সহজ মাধ্যম।

তবে অটোরিকশার এই ব্যাপক বিস্তারের আড়ালে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদনশীল খাত থেকে শ্রমশক্তির একটি অংশ অটোরিকশা চালানোর পেশায় চলে যাওয়ায় কৃষি, নির্মাণ ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে শ্রমিক সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

উৎপাদনশীল খাত থেকে শ্রমশক্তির সরে যাওয়া

স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক শ্রমিক কায়িক শ্রমের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম শারীরিক পরিশ্রম এবং নিজের সময় অনুযায়ী কাজ করার সুবিধার কারণে অটোরিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে দিনমজুরি, কৃষিশ্রম ও নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিকদের একটি অংশ এ পেশায় চলে যাচ্ছেন।

অটোরিকশা চালিয়ে দৈনিক আয় দৃশ্যত আকর্ষণীয় মনে হলেও জমা, ব্যাটারি চার্জের বিদ্যুৎ খরচ, মেরামত ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দেওয়ার পর চালকের প্রকৃত আয় অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশার তুলনায় কম। ফলে স্বল্পমেয়াদি আয়ের সুবিধার জন্য উৎপাদনশীল খাত থেকে শ্রমশক্তি সরে গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় উৎপাদন ও অর্থনীতিতে।

কৃষি ও নির্মাণ খাতে শ্রমিক সংকট

কৃষি মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গেলে অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে নির্মাণ খাতেও। শ্রমিক সংকটের কারণে কোথাও বাড়ছে শ্রমের মজুরি, কোথাও কাজের সময়সূচি পিছিয়ে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র শিল্প ও কারখানাগুলোও প্রয়োজনীয় শ্রমিক না পাওয়ার সমস্যায় পড়ছে।

অন্যদিকে, তরুণদের একটি অংশ কোনো কারিগরি দক্ষতা অর্জন না করে সরাসরি অটোরিকশা চালানোর পেশায় প্রবেশ করায় দীর্ঘমেয়াদি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি

শ্রমবাজারের পাশাপাশি মফস্বল শহরগুলোর পরিবহন ব্যবস্থাতেও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার বড় সমস্যা তৈরি করছে। অনেক স্থানে নির্দিষ্ট রুট, পার্কিং ব্যবস্থা ও চলাচলের শৃঙ্খলা না থাকায় সড়কের মোড়ে মোড়ে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক অটোরিকশা প্রয়োজনীয় অনুমোদন, ফিটনেস বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই সড়কে চলাচল করছে। অপরিকল্পিতভাবে যাত্রী ওঠানামা, যেখানে-সেখানে থামা এবং ট্রাফিক আইন না মানার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

হালকা কাঠামো, সীমিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অনেক চালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় সংঘর্ষ বা উল্টে যাওয়ার ঘটনায় যাত্রী ও পথচারীরা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

বন্ধ নয়, প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা

তবে অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

এ ক্ষেত্রে প্রতিটি এলাকায় অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, নির্দিষ্ট রুট ও পার্কিং ব্যবস্থা চালু এবং প্রধান সড়কের পরিবর্তে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়কে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা জরুরি।

অটোরিকশার কারিগরি নিরাপত্তা, ব্রেকিং ব্যবস্থা, ব্যাটারি ও গতিসীমা নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বা সংশ্লিষ্ট কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে মানসম্মত নিরাপত্তা বিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে।

বিকল্প কর্মসংস্থানে জোর দেওয়ার তাগিদ

শ্রমিকদের উৎপাদনশীল খাতে ধরে রাখতে হলে শুধু অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; কৃষি, নির্মাণ ও ক্ষুদ্র শিল্পে কর্মপরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি উপযুক্ত মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে তরুণ ও উদীয়মান যুবসমাজকে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ করে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। অটোরিকশা চালানোকে জীবিকার একটি বিকল্প হিসেবে রাখা যেতে পারে, তবে এটিকে যেন দেশের বিশাল যুবশক্তির প্রধান কর্মসংস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে না দেওয়া হয়—এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের এখনই পরিকল্পনা নিতে হবে।

নীতিনির্ধারণে এখনই নজর প্রয়োজন

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা একদিকে যেমন বহু মানুষের তাৎক্ষণিক জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে এর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার শ্রমবাজার, নগর ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তায় নতুন চাপ তৈরি করছে। তাই বিষয়টিকে কেবল যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিতে না দেখে শ্রমবাজার, কর্মসংস্থান, নগর ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তার সমন্বিত সমস্যা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

উৎপাদনশীল খাতে শ্রমশক্তি ধরে রাখা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, অটোরিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণই হতে পারে এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।