
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার অন্যতম প্রধান শক্তি হচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। একটি জাতির মেধা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে ব্যয় করার পর অবসরে গিয়ে অনেক শিক্ষক-কর্মচারীকেই চরম অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও অবহেলার মধ্যে জীবন কাটাতে হয়।
সম্প্রতি ১৮ মে ২০২৬ তারিখে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। নবগঠিত বোর্ডের চেয়ারম্যান, সদস্য সচিব ও সম্মানিত সদস্যবৃন্দকে অভিনন্দন জানিয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা ট্রাস্টের কার্যক্রম, অনিয়ম, ধীরগতি ও অস্বচ্ছতার কারণে হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
বাস্তবতা হচ্ছে—অবসরের পর অনেক শিক্ষক-কর্মচারীর জীবন হয়ে পড়ে অসহনীয়। বেতন বন্ধ হয়ে যায়, অথচ সংসারের ব্যয় থেমে থাকে না। কারও সন্তানদের উচ্চশিক্ষা অসমাপ্ত, কারও মেয়ের বিয়ে বাকি, আবার কেউ বার্ধক্যজনিত জটিল রোগে আক্রান্ত। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, সম্মানবোধের কারণে অধিকাংশ শিক্ষক তাঁদের কষ্ট প্রকাশ করতেও সংকোচবোধ করেন। জীবনের শেষ বয়সে এসে তাঁদের অনেকেই নীরবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এ অবস্থায় কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ড কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের শেষ আশ্রয়স্থল। তাই এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারের হাসি-কান্না, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং সম্মানের প্রশ্ন।
অতীতে বিশেষ ক্যাটাগরি—যেমন মৃত্যু, দুরারোগ্য ব্যাধি কিংবা কন্যাদায়গ্রস্ততার নামে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার নানা অভিযোগ শিক্ষক সমাজে হতাশা সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ ছিল, প্রকৃত অসহায়দের চেয়ে প্রভাবশালীরা অগ্রাধিকার পেয়েছেন। ফলে সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। নবগঠিত বোর্ডের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
শুধু পাওনা পরিশোধ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; প্রয়োজন একটি আধুনিক, তথ্যভিত্তিক ও অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা। বর্তমানে অধিকাংশ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী জানেন না কোন মাস পর্যন্ত ফাইল নিষ্পত্তি হয়েছে, তাঁদের আবেদন কোন অবস্থায় রয়েছে কিংবা কতদিন অপেক্ষা করতে হবে। এই অনিশ্চয়তা মানসিক যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই দ্রুত একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে সরকারের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে। ফান্ড সংকটের বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যাঁরা সারাজীবন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল রেখেছেন, তাঁদের প্রাপ্য নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। প্রয়োজন হলে বিশেষ বরাদ্দ, স্থায়ী তহবিল গঠন কিংবা বিকল্প আর্থিক কাঠামো তৈরির মাধ্যমে এ সংকট সমাধানে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
নবগঠিত বোর্ডে এমন অনেক প্রতিনিধি রয়েছেন, যারা অতীতে শিক্ষক সমাজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। তাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা—তাঁরা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষতা, মানবিকতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।
মনে রাখতে হবে, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁদের ন্যায্য অধিকার। এই অধিকার আদায়ে বিলম্ব মানে তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়ে অনিশ্চয়তা ও কষ্টকে দীর্ঘায়িত করা।
নবগঠিত বোর্ড যদি সততা, স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে পারে, তবে শুধু পাওনা পরিশোধই নয়—শিক্ষক সমাজের হারানো আস্থাও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। আর সেটিই হবে এই বোর্ডের সবচেয়ে বড় সফলতা।