
পঞ্চখণ্ড আই ডেস্ক :
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় ইটালী পাঠানোর নামে শতাধিক মানুষের কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত দুই সহোদর—কাওছার হোসেন ও দেলোয়ার হোসেন—বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের বিক্ষোভ, পাল্টাপাল্টি মামলা এবং পুলিশের তদন্তে বিষয়টি এখন উপজেলার সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, কাওছার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ইটালীতে বসবাস করে আসছেন। প্রথমদিকে তিনি ১০-১২ জনকে কৃষি ভিসায় ইটালী পাঠাতে সক্ষম হন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ইউরোপগামী হওয়ার আগ্রহ বাড়ে। পরবর্তীতে জনপ্রতি ১৪-১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ইটালী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ভুক্তভোগীরা কেউ সম্পূর্ণ, আবার কেউ আংশিক অর্থ তার দেশে অবস্থানরত ভাই দেলোয়ার হোসেনের কাছে জমা দেন। এভাবে প্রায় ১০ কোটি টাকার বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে ৪-৫ বছর পার হলেও অধিকাংশ ব্যক্তি ইটালী যেতে না পারায় টাকা ফেরতের দাবি ওঠে। এ অবস্থায় কাওছার হোসেন বিদেশে আত্মগোপনে চলে যান এবং দেলোয়ার হোসেনও দেশে লাপাত্তা হয়ে যান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ১৭ এপ্রিল ভুক্তভোগীরা অভিযুক্তদের বাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। পরে মধ্যরাতে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ঘটনায় দুই পক্ষ থেকেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ২০ এপ্রিল সিলেটের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী নাদিয়া আক্তার বাদী হয়ে একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলায় বসতবাড়িতে হামলা, লুটপাটের চেষ্টা, সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে মাথিউরা খলাগ্রামের রহিম উদ্দিনের ছেলে শিপলু আহমদ (৪০), আলম আহমদ (৩৫) ও ইমন আহমদ (৩০), কান্দিগ্রামের রফিক উদ্দিনের ছেলে সাহেদ আহমদ (২৫), খলাগ্রামের মরম উদ্দিনের ছেলে আমজাদ হোসেন (৩০), গোলাপগঞ্জের বাগলা গ্রামের কবির আহমদ পিরেরচক গ্রামের সাইব উদ্দিনের ছেলে ইকবাল আহমদ (৪০) সহ অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জনকে আসামী করা হয়। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
অপরদিকে, ২৪ এপ্রিল ভুক্তভোগীদের পক্ষে মাথিউরার দুধবকশি গ্রামের আজিম উদ্দিন বিয়ানীবাজার থানায় পৃথক একটি প্রতারণা মামলা দায়ের করেন। এতে জলঢুপ পাড়িয়াবহর গ্রামের সফাত আলীর ছেলে দেলওয়ার হোসেন (৪৫), আরকান আলীর ছেলে সফাত আলী (৬০), সফাত আলীর ছেলে ইকবাল হোসেন (৩৭), তারেক হোসেন (৩০), তাহের হোসেন (২৭), কাওসার আহমদ (৩০) কে আসামী করা হয়। অভিযোগে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে দুটি মামলাই পুলিশের তদন্তাধীন রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের উদ্যোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্য ও ভুক্তভোগীদের মধ্যে একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমাধান হয়নি।
অভিযুক্তদের পিতা সফাত আলী অজ্ঞাত স্থান থেকে জানান, ইটালী দূতাবাস বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রদান বন্ধ করে দেওয়ায় তার ছেলেরা বিপাকে পড়েছে। পাশাপাশি বিদেশি নিয়োগকর্তাদের কাছে অগ্রিম অর্থ প্রদান করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ওমর ফারুক বলেন, “দুটি মামলাই গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে।”
এদিকে, প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা তাদের অর্থ ফেরতের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।