Eng
আইন-আদালত

আদালতে বিয়ানীবাজার মডেল মসজিদের প্রস্তাবিত ভূমি-জটিলতার শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি

প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৭:১৯ অপরাহ্ণ



নিজস্ব প্রতিবেদক, বিয়ানীবাজার:
বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাবিত ভূমিকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ভূমি-স্বত্বসংক্রান্ত বিরোধের আইনানুগ নিষ্পত্তি হয়েছে। স্বত্ব বাটোয়ারা মোকদ্দমা নং-২৪০/২০১৮-এ বাদী ও বিবাদীপক্ষের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সোলেনামা দাখিল, সত্যপাঠসহ জবানবন্দি গ্রহণ এবং পরবর্তীতে আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে বিরোধটির নিষ্পত্তি হয় বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

গত ৮ সেপ্টেম্বর সিলেটের যুগ্ম জেলা জজ ৩য় আদালতে বিচারাধীন মামলাটিতে বাদীপক্ষে এডভোকেট এম. এ. হাসান তালুকদার এবং বিবাদীপক্ষে এডভোকেট রফিক উদ্দিন আহমদ মজুমদার সোলেনামা দাখিল করেন। সোলেনামা মঞ্জুরের পর আদালতে বাদীপক্ষের আতাউর রহমান এবং বিবাদীপক্ষের লুৎফুর রহমান, খাসাড়ীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খায়রুল আলম ও সেক্রেটারি মো. ফজলুর রহমান বাবুল সত্যপাঠসহ জবানবন্দি প্রদান করেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, বিয়ানীবাজার উপজেলার খাসাড়ীপাড়া মৌজার বি.এস. ২৯৭ নং খতিয়ানের অন্তর্গত বি.এস. ১২৭ নং দাগের ভূমির স্বত্ব ও অংশ নিয়ে বিরোধটি দীর্ঘদিন ধরে আদালতে বিচারাধীন ছিল। মডেল মসজিদের জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রস্তাবিত হওয়ায় বিরোধটির শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

সোলেনামায় ভূমি নিয়ে যে সমঝোতা

দাখিলকৃত সোলেনামায় খাসাড়ীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ৬৫ শতক ভূমির অংশ হিসেবে বি.এস. ১২৭ নং দাগের ৭.৪৪ শতক ভূমি বাদী আতাউর রহমান গং কর্তৃক খাসাড়ীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির অনুকূলে দানের কথা উল্লেখ করা হয়। সোলেনামা অনুযায়ী, ওই ভূমি মসজিদ কমিটির দখলে রয়েছে।

একই সোলেনামায় ১৭৭৯/১৭ ইং নম্বর সাফ কবালায় বর্ণিত বি.এস. ১২৭ নং দাগের ৫৩ শতক ভূমি খাসাড়ীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পক্ষে সভাপতি ও সেক্রেটারির নামে হস্তান্তরের বিষয়টি স্বীকার করা হয়। এ নিয়ে বাদীপক্ষের ভবিষ্যতে কোনো দাবি, দায়, আপত্তি বা বিরোধ থাকবে না বলেও সমঝোতার শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোলেনামার আরেকটি শর্তে বলা হয়, বি.এস. ১২৭ নং দাগে মূল বিবাদী লুৎফুর রহমানের প্রাপ্য অংশের অতিরিক্ত ভূমি হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বি.এস. ১২৬ নং দাগের মোট ৫ শতক ভূমি বাদীপক্ষ আতাউর রহমান গংয়ের প্রাপ্য হবে।

এ ছাড়া পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বি.এস. ১২৭ নং দাগের ৪ শতক ভূমি খাসাড়ীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ কমিটি বাদীপক্ষ আতাউর রহমান গংয়ের অনুকূলে হস্তান্তরে সম্মত হয়। স্থানীয় আপোষনামায় উক্ত ভূমির মূল্য শতকপ্রতি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথাও উল্লেখ রয়েছে। একইসাথে পক্ষগণ সোলেনামার শর্তগুলো মামলার ডিক্রির অংশ হিসেবে গণ্য করার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন।

সমঝোতায় ডিক্রি

মামলার এ সমঝোতা প্রথমে ছিল বাদী-বিবাদীপক্ষের পারস্পরিক আপোষের ভিত্তিতে করা সোলেনামা এবং আদালতের কাছে আংশিক ডিক্রি প্রদানের আবেদন। এরপর উভয় পক্ষের জবানবন্দি গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে সোলেনামার ভিত্তিতে মামলার সংশ্লিষ্ট বিরোধের আইনানুগ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ জানিয়েছে।

মডেল মসজিদের স্থান নির্ধারণের প্রেক্ষাপট

বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের স্থান নির্ধারণের লক্ষ্যে খাসাড়ীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ কমিটির সম্মতিতে ২৭ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ভূমির পুরোনো বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে।

বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ বাস্তবায়ন নাগরিক উদ্যোগ কমিটি মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেয়। কমিটির আহ্বায়ক মো. আতাউর রহমান ও সচিব মো. জমির হোসাইন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির পথে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন। এর ধারাবাহিকতায় অঙ্গীকারনামা ও আপোষনামা সম্পাদিত হয় এবং পরবর্তীতে তা আদালতে সোলেনামা হিসেবে দাখিল করা হয়।

খাসাড়ীপাড়াবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা

সমঝোতা প্রক্রিয়ায় খাসাড়ীপাড়া গ্রামের দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা, পরামর্শ, সমর্থন ও সদিচ্ছার কথা উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কমিটির আহ্বায়ক মো. আতাউর রহমান বলেন, ” দীর্ঘদিনের একটি বিরোধের শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক নিষ্পত্তি আমাদের সবার জন্য আনন্দ ও স্বস্তির বিষয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমঝোতা ও ঐক্যের মাধ্যমে জটিল সমস্যারও সুন্দর সমাধান সম্ভব—এটি তারই একটি দৃষ্টান্ত।”

কমিটির সমন্বয়ক শাহেদ আহমদ বলেন, পারস্পরিক আলোচনা, শ্রদ্ধা ও সমঝোতার মাধ্যমে একটি জটিল বিষয় শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির পথে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা ও সম্মিলিত সদিচ্ছা এ প্রক্রিয়াকে সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কমিটির সচিব মো. জমির হোসাইন এ উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ, দেশে-বিদেশে অবস্থানরত শুভাকাঙ্ক্ষী এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতাকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

বাদী আতাউর রহমান গং এবং খাসাড়ীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি মো. ফজলুর রহমান বাবুলও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতাকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, এই নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে স্থানীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হবে এবং বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ভূমি নিয়ে আর কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না।