
শিক্ষকস্বল্পতা, অবকাঠামোগত দুর্দশা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম; কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা
নিজস্ব প্রতিবেদক| পঞ্চখণ্ড আই :
শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক বিদ্যালয়। অথচ ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিয়ানীবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী শ্রীধরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (বিদ্যালয় কোড: ৯৯৬০২১১০৬০৫) দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিক্ষার মান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগুলো বিদ্যমান থাকলেও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে মোট ৩৪০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ৪৩ জন, প্রথম শ্রেণিতে ৩৮ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩৮ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৩৭ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৩৫ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৪৯ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ মোট ১০টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৮ জন শিক্ষক। একজন দপ্তরি কর্মরত থাকলেও শিক্ষকসংকটের কারণে পাঠদান কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের মে মাসে মনোয়ারা বেগম নামে একজন সহকারী শিক্ষকের এ বিদ্যালয়ে যোগদানের আদেশ জারি হলেও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও তিনি যোগদান করেননি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে অন্যত্র প্রতিস্থাপনের কথা জানানো হলেও বিদ্যালয়টি এখনো শূন্য পদ পূরণের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সহকারী শিক্ষক মাহমুদা খানম পদত্যাগ করায় আরেকটি পদ শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষকস্বল্পতা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবনের বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ায় পাঠদান ব্যাহত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশব্লক নির্মাণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যালয়ের সামগ্রিক অবকাঠামো সংস্কার, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় অভিভাবকদের ভাষ্য, একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়গুলো অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, পাঠদানের মান এবং বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলরুবা ছাদিয়া চৌধুরী বলেন, “বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকসংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ, জরাজীর্ণ ভবনের সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে শিক্ষার্থীদের আরও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।”
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কলামিস্ট আতাউর রহমান বলেন, “একটি দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এভাবে অবহেলিত থাকতে পারে না। প্রাথমিক শিক্ষাই জাতির ভিত্তি। শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি দূর করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আজকের শিশুদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমন নাজুক অবস্থা শিক্ষাবান্ধব রাষ্ট্রের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার, ওয়াশব্লক নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়ন বরাদ্দ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট বিভাগ দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ পায় এবং বিদ্যালয়টি তার হারানো ঐতিহ্য ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।