
আতাউর রহমান:
দেশের বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য গঠিত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড–এর মাধ্যমে অবসর ও কল্যাণ সুবিধা প্রদানের কথা থাকলেও বাস্তবে হাজারো শিক্ষক আজ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কর্মজীবনে নিয়মিতভাবে বেতনের ১০ শতাংশ কেটে নেওয়া হয়েছে; শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও নির্ধারিত হারে অর্থ আদায় করা হয়েছে। তবুও অবসরের পর প্রাপ্য অর্থ পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বছরের পর বছর।
বর্তমানে প্রায় ৭২ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালের বহু আবেদনকারী এখনও অবসরকালীন অর্থ পাননি। আবেদন জমার পর কার্যক্রম শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে; ফলে প্রকৃত অর্থ হাতে পেতে চার থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে। ৬০ বছর বয়সে অবসরের পর একজন শিক্ষকের নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক সেই সময়েই চিকিৎসা, সংসার ব্যয় ও সন্তানের শিক্ষার জন্য অর্থের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। এই বিলম্ব অনেককে চরম আর্থিক সংকটে ঠেলে দিচ্ছে।
সমস্যার মূল কারণ
প্রথমত, দুই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গতি নেই।
দ্বিতীয়ত, আবেদন প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সঠিকভাবে আবেদন সম্পন্ন করতে পারছেন না।
তৃতীয়ত, অর্থপ্রদানের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় দীর্ঘসূত্রতা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
চতুর্থত, তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল শক্তিশালী করার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা সময়োপযোগী। অর্থ মন্ত্রণালয় অবসর ও কল্যাণ সুবিধার জন্য ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার সিড মানি বরাদ্দে সম্মতি দিয়েছে—এর মধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ড পাবে ২ হাজার কোটি এবং কল্যাণ ট্রাস্ট পাবে ২০০ কোটি টাকা। তবে স্থায়ী তহবিল গঠনই যথেষ্ট নয়; কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া দ্রুত অর্থপ্রদান সম্ভব হবে না।
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিল অনিয়মের বিষয়টি নজরে রাখার কথা বলেছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এই বক্তব্য সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবনেরই প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন।
শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আবেদন
১. অবিলম্বে শীর্ষ পদে যোগ্য ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
২. আবেদন প্রক্রিয়া সরলীকরণ ও সহায়ক সেল গঠন।
৩. অবসরোত্তর অর্থপ্রদানের সময়সীমা সর্বোচ্চ ছয় মাস নির্ধারণ।
৪. তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতে নিরীক্ষা জোরদার।
৫. দীর্ঘদিনের আবেদনগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি।
শিক্ষকতা জাতি গঠনের মহান দায়িত্ব। যারা সারাজীবন শিক্ষার্থীদের আলোকিত করেছেন, তাঁদের শেষ জীবনে আর্থিক অনিশ্চয়তা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অমর্যাদাকর। তাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য অর্থ দ্রুত ও সম্মানজনকভাবে প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর আন্তরিক ও জরুরি পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি।