
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা–মিঠামইন–অষ্টগ্রাম) আসনের রায় আমাদের রাজনীতির দৈনন্দিন হিসাবের বাইরে গিয়ে এক গভীর দেশপ্রেমের বার্তা দেয়। প্রায় ৭২ হাজার ৬২৮ ভোট ব্যবধানে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান-এর জয় শুধু একটি আসনের বিজয় নয়—এটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে মানুষের আস্থার পুনর্নিশ্চয়তা। ১৫০টি ভোটকেন্দ্রের বেসরকারি ফলে তিনি পেয়েছেন ১,২৯,৯৫৪ ভোট, আর তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৫৭,৩২৬ ভোট। ব্যবধান সংখ্যায় বড়, কিন্তু অর্থে আরও বড়—কারণ এটি মূল্যবোধের পক্ষে মানুষের এককণ্ঠ সমর্থনের প্রতিফলন।

উপজেলা ভিত্তিক ফলও একই কথাই বলে। ইটনায় ৫৪,২৮৯ বনাম ২০,৯৩৯; মিঠামইনে ২৬,৭৫৬ বনাম ২২,৪৫১; অষ্টগ্রামে ৪৮,৯০৯ বনাম ১৩,৯৩৬—তিন হাওরেই ভোটাররা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, উন্নয়ন-রাজনীতির সঙ্গে নৈতিক কম্পাস হারালে তারা তা মেনে নেন না। তারা ইতিহাসের দায়বদ্ধতাকে আবারও ভোটের বাক্সে ফিরিয়ে এনেছেন।
ফজলুর রহমান সিলেটে জন্মগ্রহণ না করেও নিজেকে সিলেটের সন্তান বলে পরিচয় দিতে কুণ্ঠা করেন না—এই পরিচয় আসলে ভূগোলের নয়, চেতনার। তিনি কেবল কোনো অঞ্চলের প্রতিনিধি নন; তিনি এই দেশের মুক্তিকামী মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। একাত্তরের স্মৃতি তাঁর কাছে নস্টালজিয়া নয়—এটি নীতির মানদণ্ড। তাই ফল ঘোষণার পর তাঁর উচ্চারণ— “এই জয় ব্যক্তির নয়—এটা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের জয়”—এই সময়ের রাজনীতিতে এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নৈতিক ঘোষণা।
আমরা প্রায়ই নিজেদের অকৃতজ্ঞ জাতি বলে দাগিয়ে দিই। তবু ইতিহাস বলে, সংকটের মুহূর্তে এই জাতি বারবার বিবেকের দিকেই ফিরে তাকিয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৪–এর রায় সেই ফেরারই আরেকটি উদাহরণ। এখানে ভোটাররা ব্যক্তিকে নয়, আদর্শকে বেছে নিয়েছেন—এটাই গণতন্ত্রের একটি স্বাস্থ্যকর লক্ষণ।
এই ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য অবশ্যই আছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল হাওরাঞ্চলে তাদের অবস্থান শক্ত করেছে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য হলো, বাংলাদেশ-এর মানুষ আবারও জানিয়ে দিয়েছেন—উন্নয়ন, ন্যায় ও স্বাধীনতার চেতনা একে অপরের বিকল্প নয়; তারা একে অপরের শর্ত। রাজনীতি যদি এই শর্ত ভুলে যায়, ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত তা মনে করিয়ে দেন।
এই জয় আমাদের শেখায়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেবল ক্ষমতার অঙ্কে নির্ধারিত হয় না—তা নির্ধারিত হয় নৈতিক সাহস ও আদর্শিক দৃঢ়তায়। যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “এই জয় ব্যক্তির নয়,” তখন তিনি আসলে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষ ও মূল্যবোধকে ফিরিয়ে আনেন। আর সেটাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দেশপ্রেমের বার্তা।