Eng
উপসম্পাদকীয়

যা হারিয়ে যায়, তারও একটি কারণ থাকে — ✍️ আতাউর রহমান

প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬ | ৩:১৭ অপরাহ্ণ




 

জীবনে কিছু হারানোর শব্দ খুব নির্মম। একটি সম্পর্ক হঠাৎ শেষ হয়ে যায়। বহুদিনের চাকরিটি আর থাকে না। বুকের মধ্যে যত্ন করে রাখা একটি স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কোনো প্রিয় মানুষ দূরে সরে যায়। কোনো দরজা, যার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছি, হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।

তখন মনে হয়—জীবন বুঝি আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।

আমরা হারানোর হিসাব করি; কিন্তু হারানোর অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে দেখি না। আমরা দেখি—গাছের একটি ডাল কেটে ফেলা হয়েছে। গাছের ক্ষতি হয়েছে। অথচ মালি জানেন, সেই ডালটি হয়তো রোগাক্রান্ত ছিল; সেখানে পোকা বাসা বেঁধেছিল, কিংবা সেটি গাছের শক্তি শুষে নিচ্ছিল। তাই তাঁর কাঁচি নিষ্ঠুরতার অস্ত্র নয়, ভবিষ্যৎ ফুলের প্রস্তুতি।

জীবনও কখনো কখনো এমন এক মালি দিয়ে আমাদের ছাঁটাই করে, যাঁর পরিকল্পনা আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না।

আমরা যাকে বিচ্ছেদ বলি, হয়তো সেটিই ছিল রক্ষা। যাকে ব্যর্থতা বলি, হয়তো সেটিই ছিল দিক পরিবর্তনের সংকেত। যে চাকরি হারিয়ে আমরা ভেঙে পড়ি, হয়তো সেই চাকরিই আমাদের সম্ভাবনাকে আটকে রেখেছিল। যে স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় চোখে জল আসে, হয়তো তার চেয়েও বড় কোনো স্বপ্নের জন্য জায়গা তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু মানুষ তো ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না।

এই না-পারাটিই মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এবং একই সঙ্গে বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

জীবনের একটি অদ্ভুত নিয়ম আছে—ঘটনার মুহূর্তে যার অর্থ বোঝা যায় না, সময়ের ব্যবধানে তার অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কখনো কোনো মানুষকে হারিয়ে আমরা ভেবেছি, ‘আমি শেষ।’ কয়েক বছর পর বুঝেছি—সেই বিচ্ছেদই আমাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে এনেছিল। কখনো কোনো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে আমরা হতাশ হয়েছি। পরে দেখেছি, সেই ব্যর্থতাই আমাদের এমন একটি পথে নিয়ে গেছে, যেখানে আমাদের প্রকৃত সামর্থ্যের বিকাশ ঘটেছে।

অর্থাৎ, জীবনের প্রতিটি বন্ধ দরজা শাস্তির দরজা নয়; কিছু দরজা ভুল ঘর থেকে বের করে দেওয়ার দরজা।

আমরা বর্তমানের ব্যথা দিয়ে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। এটাই আমাদের ভুল। কারণ, বীজ মাটির নিচে পড়ে থাকলে বাইরে থেকে মনে হয়—সে হারিয়ে গেছে। অথচ তার ভেতরে তখন জন্মের প্রস্তুতি চলছে।

রাতকে যদি কেউ দিনের শেষ বলে মনে করে, সে ভোরের দর্শন থেকে বঞ্চিত হয়। শীত যদি গাছের কাছে মৃত্যুর মতো মনে হয়, বসন্ত তার অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি বহন করে। তাই জীবনের কিছু নীরবতা আসলে প্রস্তুতির শব্দ।

আমরা প্রায়ই ধৈর্যকে ভুল বুঝি। মনে করি, কিছু না করে বসে থাকা, ভাগ্যের ওপর সব ছেড়ে দেওয়া—এটাই ধৈর্য।

না।

ধৈর্য হলো—ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেও নিজের শিকড়কে ভুলে না যাওয়া। ধৈর্য হলো—চেষ্টা করার পর ফলাফল বিলম্বিত হলেও চেষ্টা বন্ধ না করা। ধৈর্য হলো—আজ উত্তর না পেলেও বিশ্বাস রাখা যে, প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আজই পাওয়া জরুরি নয়।

কৃষক বীজ বপন করে প্রতিদিন মাটি খুঁড়ে দেখেন না—বীজটি অঙ্কুরিত হলো কি না। তিনি জানেন, কিছু কাজ চোখের আড়ালে সম্পন্ন হয়।

মানুষের জীবনেও এমন কিছু কাজ আছে, যার খবর মানুষ জানে না—শুধু স্রষ্টা জানেন। তাই কখনো কখনো অপেক্ষা করতে হয়। নবী-রাসুলদের জীবনেও ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা-

হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, কূপ থেকে কারাগার—একটির পর একটি অন্ধকার যেন তাঁর পথ আটকে দিয়েছিল। কিন্তু কূপ তাঁর শেষ ঠিকানা হয়নি, কারাগারও হয়নি। যে মানুষকে একদিন পরিত্যক্ত মনে হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তিনিই হয়ে উঠেছিলেন সম্মান ও দায়িত্বের কেন্দ্রে। হজরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবন আমাদের আরও কঠিন শিক্ষা দেয়—দীর্ঘ কষ্ট মানেই পরাজয় নয়।

আগুন যেমন সোনা তৈরি করে না, বরং সোনার ভেতরের খাঁটি রূপ প্রকাশ করে; তেমনি বিপদ সবসময় মানুষের শক্তি তৈরি করে না, অনেক সময় তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা শক্তিকে প্রকাশ করে। কষ্ট মানুষকে ভাঙতে পারে, আবার গড়তেও পারে।

তাই বিপদের সময় প্রশ্নটি শুধু হওয়া উচিত নয়—‘কেন আমার সঙ্গে এমন হলো?’

আরেকটি প্রশ্নও করা দরকার— ‘এই পরিস্থিতি আমাকে কী শেখাতে এসেছে?’

একজন মালি যদি গাছের কোনো ডাল কখনো না কাটেন, গাছ হয়তো বড় হবে; কিন্তু সব ডালে সমানভাবে ফুল-ফল নাও আসতে পারে। অতিরিক্ত ডাল গাছের শক্তি ছড়িয়ে দিতে পারে।

মানুষের জীবনেও অতিরিক্ত কিছু থাকে—অপ্রয়োজনীয় সম্পর্ক, অহংকার, ভুল অভ্যাস, ভুল লক্ষ্য, ভুল প্রত্যাশা, এমনকি কিছু স্বপ্নও।

সবকিছু ধরে রাখার নাম জীবন নয়। কিছু কিছু জিনিস ছেড়ে দিতে হয়, যাতে প্রয়োজনীয় জিনিসটি বাঁচে।

কখনো কখনো আল্লাহ আমাদের জীবন থেকে এমন কিছু সরিয়ে দেন, যা আমরা নিজের শক্তিতে সরাতে পারতাম না। তখন আমরা কাঁদি। প্রতিবাদ করি। প্রশ্ন করি।

কিন্তু অনেক বছর পর পেছনে তাকিয়ে দেখি—‘আচ্ছা, তখন যদি সেটি না হারাতাম, আজ আমি এখানে পৌঁছাতাম কি?’

জীবনের কিছু উত্তর তাই সময়ের কাছে জমা থাকে।
আপনার আজকের শূন্যতাই হয়তো আগামী দিনের জায়গা। একটি ঘর যদি পুরোনো আসবাবে পূর্ণ থাকে, সেখানে নতুন কিছু রাখার জায়গা থাকে না। জীবনও তেমন।

কখনো পুরোনো কিছু সরে যায় বলেই নতুন কিছুর জন্য জায়গা তৈরি হয়। তাই জীবনে কোনো কিছু হারালে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ব্যর্থ ঘোষণা করবেন না। কোনো সম্পর্ক ভেঙে গেলে নিজের মূল্য নিয়ে সন্দেহ করবেন না। কোনো সুযোগ হাতছাড়া হলে ভবিষ্যৎকে অন্ধকার ভাববেন না।

বরং কিছুটা থামুন। নিজেকে সময় দিন। দোয়া করুন।
চেষ্টা চালিয়ে যান। আর বিশ্বাস রাখুন—আপনি হয়তো গল্পের একটি পৃষ্ঠা দেখছেন; যিনি আপনার জীবন লিখছেন, তিনি পুরো বইটি দেখছেন।

মালি যখন ডাল কাটেন, গাছ তখন কাঁচির ব্যথা বোঝে; মালি বোঝেন আগামী বসন্তের ভাষা।

আমরাও অনেক সময় জীবনের কাঁচির ব্যথাটুকুই বুঝি। বুঝি না—কোন রোগাক্রান্ত ডালটি সরিয়ে দেওয়া হলো, কোন অন্ধকার পথ থেকে আমাদের ফিরিয়ে আনা হলো, কোন নতুন ফুলের জন্য জায়গা তৈরি হলো। তাই সব হারানোকে ক্ষতি ভাববেন না।

কিছু হারানো হয়তো রক্ষা। কিছু বিচ্ছেদ হয়তো মুক্তি।
কিছু ব্যর্থতা হয়তো দিকনির্দেশনা। কিছু অপেক্ষা হয়তো প্রস্তুতি। আর কিছু বন্ধ দরজা হয়তো এমন এক দরজার সামনে নিয়ে যায়, যার অস্তিত্বই আমরা আগে জানতাম না।

জীবন যখন আপনাকে ছাঁটাই করে, তখন কাঁদতে পারেন—মানুষ বলে কথা। কিন্তু ভেঙে পড়বেন না।কারণ গাছও ছাঁটাইয়ের পর কিছুদিন নীরব থাকে।

তারপর একদিন—
সেই কাটা ডালের পাশে জন্ম নেয় একটি ছোট্ট সবুজ কুঁড়ি। হয়তো আপনার জীবনেও সেই কুঁড়িটি আসছে।
শুধু একটু ধৈর্য ধরুন।

যা কেটে গেছে, তার দিকে সারাজীবন তাকিয়ে থাকবেন না; যে কুঁড়িটি আসছে, তার জন্য বেঁচে থাকুন।