Eng
উপসম্পাদকীয়

আত্মসমালোচনার আয়না: ভবিষ্যতের কাছে আমাদের দায় | —✍️ আতাউর রহমান

প্রকাশিত: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ



সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলায়, মানুষের জীবনযাপন বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়; কিন্তু মানুষের ভেতরের কিছু প্রবণতা আশ্চর্যভাবে একই থেকে যায়। আমরা আধুনিক হয়েছি, হাতে স্মার্টফোন এসেছে, মুহূর্তে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খবর পৌঁছে যাচ্ছে; অথচ নিজের ভেতরের খবরটি জানতে আমাদের আগ্রহ কমেছে।

একসময় মানুষ চিঠির উত্তর পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করত। এখন মেসেজের উত্তর কয়েক মিনিট দেরি হলেই অস্থিরতা তৈরি হয়। যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা কি একই হারে বেড়েছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো ‘বন্ধু’ তৈরি হয়েছে, অথচ বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ কখনো কখনো হাতেগোনা।

আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ছবি তুলি, মুহূর্ত ধরে রাখি; কিন্তু অনেক সময় সেই মুহূর্তের অনুভূতিটিই হারিয়ে ফেলি। সুখকে উপভোগ করার চেয়ে সুখের ছবি দেখানো যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জীবন হয়ে উঠছে ক্রমশ প্রদর্শননির্ভর।

এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, সামাজিক আচরণেও ছাপ ফেলছে। আমরা নৈতিকতার কথা বলি, কিন্তু সুবিধার জায়গায় নীতির সঙ্গে আপস করি। আইন মানার কথা বলি, কিন্তু নিজের কাজ দ্রুত করিয়ে নিতে নিয়মের ব্যতিক্রম খুঁজি। অন্যের দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ হই, অথচ নিজের স্বার্থে করা ছোট অনিয়মকে ‘ব্যবস্থা’ বলে এড়িয়ে যাই।

এভাবেই বড় অনিয়মের জন্ম হয় ছোট আপস থেকে।

একজন চালক সিগন্যাল অমান্য করে কয়েক মিনিট বাঁচান। আরেকজন লাইনে না দাঁড়িয়ে নিজের কাজ আগে সারেন। কেউ পরীক্ষায় নকলকে সামান্য ব্যাপার ভাবেন, কেউ অফিসের সময়কে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। প্রতিটি ঘটনা আলাদা করে ছোট মনে হতে পারে; কিন্তু এগুলো একত্রিত হয়েই একটি সমাজের নৈতিক মানচিত্র তৈরি করে।

প্রযুক্তিও আমাদের নতুন এক আয়না দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক সেকেন্ডে লেখা তৈরি করতে পারে, ছবি বানাতে পারে, তথ্য সাজিয়ে দিতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি মানুষের বিবেক তৈরি করতে পারে না। একটি যন্ত্র আমাদের কাজ সহজ করতে পারে, সিদ্ধান্তের দায় নিতে পারে না। ফলে প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হচ্ছে, মানুষের নৈতিক দায়িত্বও তত বাড়ছে।

আমরা সন্তানদের হাতে সর্বাধুনিক ডিভাইস তুলে দিচ্ছি, কিন্তু তাদের হাতে মূল্যবোধ তুলে দেওয়ার কাজটি অনেক সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। তারা কী দেখছে, কাদের অনুসরণ করছে, কীকে সাফল্য মনে করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পরিবার ও সমাজের আচরণেই তৈরি হয়।

সন্তানকে বলি, ‘ভালো মানুষ হও।’ অথচ তার সামনে যদি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায় অর্থ, গাড়ি, বাড়ি ও সামাজিক প্রভাব, তবে সে কথার চেয়ে দৃশ্যমান বাস্তবতাকেই বিশ্বাস করবে।

এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের অভাব নেই; অভাব বোধহয় বিবেচনার। খবরের গতি বেড়েছে, কিন্তু সত্য যাচাইয়ের অভ্যাস অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। একটি শিরোনাম পড়েই আমরা মত গড়ে ফেলি, যাচাই না করেই তা ছড়িয়ে দিই। ফলে মিথ্যা কখনো কখনো সত্যের চেয়েও দ্রুত ভ্রমণ করে।

একটি শেয়ারও দায়িত্বের বাইরে নয়।

কারও সম্মান নষ্ট করতে কয়েক সেকেন্ড লাগে, কিন্তু সেই ক্ষত সারতে বছর কেটে যেতে পারে। তাই ডিজিটাল যুগে নাগরিক দায়িত্ব শুধু রাস্তায় আইন মানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পর্দার ওপারেও বিবেককে জাগ্রত রাখতে হয়।

আমাদের সমাজে পরিবর্তনের জন্য বড় বড় স্লোগানের চেয়ে প্রয়োজন ছোট ছোট সৎ অভ্যাস। সময়মতো দায়িত্ব পালন, প্রাপ্য অধিকার অন্যকে দেওয়া, ভুল হলে স্বীকার করা, দুর্বলকে ঠকানোর সুযোগ পেয়েও তা না করা, গুজব যাচাই না করে ছড়িয়ে না দেওয়া—এসবই সভ্যতার বাস্তব চর্চা।

কারণ একটি দেশের চরিত্র শুধু সংসদ, আদালত কিংবা প্রশাসনে প্রতিফলিত হয় না; প্রতিফলিত হয় বাজারে, বিদ্যালয়ে, অফিসে, রাস্তায় এবং আমাদের ঘরের ভেতরেও।

আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্নত প্রযুক্তি রেখে যেতে চাই—এটি প্রয়োজন। উন্নত অবকাঠামো চাই—এটিও প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি এমন একটি সামাজিক পরিবেশ রেখে যাওয়া, যেখানে সৎ থাকা অসম্ভব মনে হবে না, অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে হবে না এবং মানুষের মর্যাদা তার সম্পদের চেয়ে বড় থাকবে।

শেষ পর্যন্ত সভ্যতার আসল অগ্রগতি কেবল নতুন ভবন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট কিংবা আধুনিক যন্ত্রে মাপা যায় না। মানুষের আচরণ কতটা মানবিক হয়েছে—সেখানেই তার প্রকৃত মানদণ্ড।

তাই পরিবর্তনের জন্য অন্য কারও অপেক্ষায় থাকার সময় নেই। রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান—সবকিছুর পরিবর্তনের শুরু আসলে মানুষের ভেতর থেকেই। আমরা প্রতিদিন যে সিদ্ধান্ত নিই, যে অন্যায় মেনে নিই, যে সত্য উচ্চারণ করি কিংবা যে সুবিধা ফিরিয়ে দিই—সেসবের সমষ্টিতেই নির্মিত হচ্ছে আগামী দিনের সমাজ।

আমাদের সন্তানদের হাতে শুধু একটি উন্নত প্রযুক্তি নয়, একটি উন্নত মূল্যবোধের পৃথিবী তুলে দিতে হবে। তাদের এমন একটি সমাজ দিতে হবে, যেখানে অসততা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়, দুর্নীতি সাফল্যের সিঁড়ি নয়, ক্ষমতা অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার লাইসেন্স নয় এবং মানবিকতা দুর্বলতার নাম নয়।

আজ আমরা যে আচরণকে স্বাভাবিক করে তুলছি, আগামী প্রজন্ম সেটিকেই স্বাভাবিক জীবন বলে গ্রহণ করবে। তাই দায়িত্বটি শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নয়—দায়িত্ব আমাদেরও।

আসুন, আজ থেকেই একটি অঙ্গীকার করি—অন্যায় দেখলে নীরব থাকব না, সুযোগ পেলেও অন্যের অধিকার নেব না, না জেনে কোনো কথা ছড়াব না, দায়িত্বে ফাঁকি দেব না এবং নিজের স্বার্থের কাছে বিবেককে বিক্রি করব না।

বড় পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় পদ বা বড় ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় ছোট ছোট সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস।

আমরা যদি নিজের জায়গাটুকু সৎ রাখি, আমাদের চারপাশটুকু বদলাবে। চারপাশ বদলালে সমাজ বদলাবে। আর সমাজ বদলালেই একদিন বদলে যাবে দেশ।

মনে রাখতে হবে—ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে না; আমরাই প্রতিদিন আমাদের আচরণ দিয়ে ভবিষ্যৎ লিখছি।

তাই আসুন, এমন কিছু লিখি—যা পড়ে আমাদের সন্তানরা একদিন বলতে পারে,

‘তারা শুধু আমাদের জন্য একটি পৃথিবী রেখে যায়নি; তারা পৃথিবীটাকে আমাদের জন্য একটু ভালো করে দিয়ে গেছে।’