Eng
ফিচার

সামনে স্থানীয় নির্বাচন—ভোটের বাজারের মানুষেরা এখন কেমন আছেন! —✍️ আতাউর রহমান

প্রকাশিত: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৩:২৮ পূর্বাহ্ণ



সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হতে পারে এবং পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে এসব নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধিও গেজেট হয়েছে। ফলে নির্বাচনী প্রস্তুতির এই সময়ে শুধু কে প্রার্থী হচ্ছেন বা কে জয়ী হবেন, সেই হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ভোটের প্রকৃত মূল্য এবং একজন নাগরিকের দায়িত্ব নিয়েও ভাবা জরুরি।

কারণ নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি আমাদের স্থানীয় সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে ইতিমধ্যে পাড়া-মহল্লা, গ্রাম-গঞ্জ ও জনপদে পরিচিত মুখের আনাগোনা, গণসংযোগ, প্রতিশ্রুতি আর নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।

সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন আসে—একটি ভোটের প্রকৃত মূল্য কত?

পশুর হাটে একটি গরুর দাম লাখ টাকা। ভালো একটি ছাগলের দামও দশ হাজারের নিচে নয়। অথচ ভোটের বাজারে কোথাও কোথাও মানুষের ভোটের মূল্য নেমে আসে কয়েকশো টাকায়। তখন প্রশ্নটি শুধু অর্থের অঙ্কের থাকে না—প্রশ্ন হলো, মানুষের বিবেক কি সত্যিই এত সস্তা হয়ে গেছে?

পশু কেনার সময় মানুষ তার বয়স, জাত, স্বাস্থ্য ও ওজন বিবেচনা করেন। অথচ জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সময় প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা, জনসম্পৃক্ততা, অতীত ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে সাময়িক সুবিধা যদি বড় হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন জাগে—ভোটের বাজারের মানুষেরা এখন কেমন আছেন?

স্থানীয় নির্বাচনে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দূরের কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি নন; তিনি আমাদেরই এলাকার মানুষ। তাঁর সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে পাশের রাস্তা, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পানি নিষ্কাশন, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্থানীয় উন্নয়নের ওপর। তাই একটি ভোটের ভুল হিসাবের প্রভাবও খুব কাছ থেকে অনুভূত হতে পারে।

কয়েকশো টাকা হয়তো একটি পরিবারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু ভোটের বিনিময়ে নেওয়া সেই অর্থের কারণে যদি অযোগ্যতা, অনিয়ম কিংবা জবাবদিহির ঘাটতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তার মূল্য দিতে হতে পারে দীর্ঘ সময়। সাময়িক লাভের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক স্বার্থের এই পার্থক্যটিই নির্বাচনের আগে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন।

বিষয়টি শুধু ভোটারের নয়; প্রার্থীদের জন্যও এটি একটি নৈতিক পরীক্ষা। জনপ্রতিনিধিত্ব যদি সেবার দায়িত্ব হয়, তাহলে ভোট কেনাবেচার সংস্কৃতি সেই দায়িত্বের মর্যাদাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। নির্বাচনে অর্থের প্রভাব যত বাড়ে, রাজনীতিতে ব্যয়ের চাপও তত বাড়তে পারে; আর সেই ব্যয়ের সঙ্গে যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িয়ে যায়, তখন জনসেবার জায়গাটি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই নেতার কাজ শুধু ভোট চাওয়া নয়; ভোটের পরে মানুষের কাছে জবাবদিহি করা। জনপ্রতিনিধির কাজ শুধু নির্বাচিত হওয়া নয়; নির্বাচনের পরও জনগণের আস্থা ধরে রাখার মতো কাজ করা। রাজনৈতিক বা নির্বাচনী অর্থায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার সংস্কৃতি জরুরি।

আর ভোটারের দায়িত্বও কম নয়। পরিচিতি, আত্মীয়তা, দলীয় আনুগত্য বা সাময়িক সুবিধার বাইরে গিয়ে প্রার্থীকে দেখা দরকার তাঁর যোগ্যতা, সততা, জনসম্পৃক্ততা ও স্থানীয় সমস্যাবোধের আলোকে। কারণ ভোট একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হলেও তার প্রভাব পড়ে পুরো সমাজের ওপর।

সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানদের আমরা সততা শেখাই। তাদের বলি অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করতে। তাহলে ভোটের দিন আমাদের আচরণও সেই শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া দরকার। আজকের সামান্য সুবিধার জন্য যদি আমরা নিজের নাগরিক সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বিসর্জন দিই, তাহলে আগামী প্রজন্মকে কী মূল্যবোধ দিয়ে যাব?

স্থানীয় নির্বাচন তাই শুধু চেয়ারম্যান, মেয়র, কাউন্সিলর বা সদস্য নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি আমাদের স্থানীয় সমাজ কেমন হবে, সে সিদ্ধান্তেরও একটি সুযোগ। আমরা কি জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব চাই, নাকি ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি? আমরা কি উন্নয়ন ও সেবাকে গুরুত্ব দেব, নাকি সাময়িক সুবিধাকে?

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—সিদ্ধান্তের মালিক শেষ পর্যন্ত ভোটার। আর সেই সিদ্ধান্তের মর্যাদা রক্ষা করাও ভোটারেরই দায়িত্ব।

কারণ একটি ভোট শুধু একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের বিবেক, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দেওয়া একটি সিদ্ধান্ত।

ভোটের বাজারের মানুষেরা কেমন আছেন—তার সবচেয়ে সৎ উত্তর হয়তো ব্যালটের বাক্সে নয়, প্রতিটি ভোটারের বিবেকেই লেখা থাকবে।