Eng
আলোর ভূবণ

স্মৃতিচারণ: মাওলানা আব্দুল খালিক ছিলেন আলেমে দ্বীন ও মানুষ গড়ার কারিগর

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ



লেখক- Π আব্দুল মালেক বাবুল 

চারখাই- দেউলগ্রাম ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে যেসব ব্যক্তিত্ব নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, মরহুম মাওলানা আব্দুল খালিক তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন আলেমে দ্বীন, মাদ্রাসাশিক্ষক, ইমাম, ধর্মীয় অনুশাসনের শিক্ষক এবং সর্বোপরি মানুষ গড়ার এক নিবেদিত কারিগর। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিজে যেমন জ্ঞানচর্চা ও ইবাদতে জীবন কাটিয়েছেন, তেমনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও আদর্শ জীবনের শিক্ষা দিয়েছেন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

মরহুম মাওলানা আব্দুল খালিক বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই ইউনিয়নের দেউলগ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মসব আলী।

তাঁর শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে তৎকালীন অবিভক্ত ভারতে। সে সময় তাঁর পিতা আসামে ব্যবসা করতেন। পিতার কর্মসূত্রে তিনি আসামের বিভিন্ন দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা লাভের সুযোগ পান। শৈশবেই দ্বীনি শিক্ষার প্রতি তাঁর যে আগ্রহ ও অনুরাগ তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী জীবনে সেটিই তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

দেশভাগের পর শিক্ষাজীবন

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর তৎকালীন পূর্ব সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গাছবাড়ী মাদ্রাসায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। সেখানে তিনি অধ্যবসায় ও কৃতিত্বের সঙ্গে ফাজিল ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও অনুসন্ধিৎসু। পাঠ্যবিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কোনো বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করতেন। শিক্ষকরা তাঁর এই জ্ঞানপিপাসাকে উৎসাহ দিতেন এবং তাঁর প্রশ্ন ও অনুসন্ধানের প্রতি আন্তরিক মনোযোগ দিতেন। এ কারণে অল্প সময়েই তিনি শিক্ষকদের প্রিয় ও স্নেহভাজন ছাত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সৌভাগ্য ছিল—তিনি বৃহত্তর সিলেটের প্রখ্যাত দুই আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মরহুম হযরত মাওলানা বায়মপুরী (রহ.) এবং মরহুম হযরত মাওলানা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.)-এর সরাসরি ছাত্র হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। তাঁদের সান্নিধ্য তাঁর জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলে তাঁর পরিবারের সদস্য ও অনুসারীদের স্মৃতিতে উল্লেখ পাওয়া যায়।

অসম্পূর্ণতায়ও থেমে যায়নি জ্ঞানসাধনা

পারিবারিক আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর পক্ষে দাওরায়ে হাদিস বা কামিল পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন ফাজিল পর্যায়েই শেষ করতে হয়।

তবে শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক সমাপ্তি তাঁর জ্ঞানসাধনার সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। বরং তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—নিজের অর্জিত জ্ঞানকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই তাঁর জীবনের অন্যতম দায়িত্ব। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি ইমামতি ও শিক্ষকতাকে জীবনের প্রধান কর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন।

শিক্ষকতা: জ্ঞান বিতরণের দীর্ঘ অধ্যায়

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি তিনি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর শিক্ষকতা-জীবনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • মেওয়া মাদ্রাসা
  • বালিঙ্গা মাদ্রাসা
  • আটগঞ্জ মাদ্রাসা
  • ফুলবাড়ী আজিরিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, গোলাপগঞ্জ
  • বিয়ানীবাজার কামিল (এমএ) মাদ্রাসা
  • বৈরাগীবাজার আলিম মাদ্রাসা

আটগঞ্জ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল বলে পারিবারিক স্মৃতিতে উল্লেখ রয়েছে। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি বৈরাগীবাজার আলিম মাদ্রাসা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন ছাত্রবান্ধব ও আন্তরিক। বিশেষ করে আরবি ব্যাকরণে তাঁর দক্ষতা ছিল উল্লেখযোগ্য। আরবি ভাষার পাশাপাশি উর্দু ও ফারসি ভাষাতেও তাঁর জ্ঞান ছিল। তাঁর কাছে পড়াশোনা করা বহু শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। এভাবেই তাঁর শিক্ষকতা শ্রেণিকক্ষের সীমা অতিক্রম করে একটি বিস্তৃত প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলেছিল।

ইবাদত ও পরহেজগারি

মাওলানা আব্দুল খালিকের ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি ছিল তাঁর পরহেজগারি ও ইবাদতনিষ্ঠা।

তিনি শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে ইবাদত-বন্দেগিতে সময় কাটাতেন। ফজরের নামাজের সময় হলে তিনি নিজে মসজিদে যেতেন এবং আশপাশের মানুষকেও নামাজের জন্য জাগিয়ে দিতেন। নামাজ ও ইবাদতের প্রতি তাঁর এই আন্তরিকতা ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট।

দোয়ার সময় তিনি গভীর আবেগে কাঁদতেন। তাঁর কান্না উপস্থিত মুসল্লি ও অনুসারীদেরও আবেগাপ্লুত করে তুলত। নামাজের পর তিনি মুসল্লিদের নামাজের নিয়ম-কানুন, শুদ্ধ কিরাত এবং ইবাদতের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে নসিহত করতেন। ধর্মীয় শিক্ষা তাঁর কাছে কেবল পাঠ্যবিষয় ছিল না; বরং তা ছিল ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবন পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ।

আধ্যাত্মিক জীবন

তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনও ছিল সুসংগঠিত ও নিষ্ঠাপূর্ণ। জীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি প্রখ্যাত আলেম ও পীরে কামেল হযরত মাওলানা আব্দুর রহিম (রহ.)—চড়িপাড়ি হুজুরের মুরিদ হন। তাঁর ইন্তেকালের পর তিনি হযরত মাওলানা আব্দুল গাফফার (রহ.)—মামরখানি হুজুরের সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে আমৃত্যু তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক সান্নিধ্যে ছিলেন।

ইলম, আমল ও আধ্যাত্মিক অনুশাসনের সমন্বয় তাঁর ব্যক্তিত্বকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল।

পরিবার ও উত্তরসূরিদের ধর্মীয় শিক্ষা

মাওলানা আব্দুল খালিকের জীবনের অন্যতম বড় কৃতিত্ব তাঁর সন্তানদের শিক্ষাদান ও গড়ে তোলা। তিনি স্ত্রী ও সাত ছেলে রেখে যান। তাঁর সাত ছেলেই ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত এবং বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত—এটি তাঁর পারিবারিক শিক্ষাদর্শনের সবচেয়ে দৃশ্যমান উত্তরাধিকার।

তাঁর বড় ছেলে মাওলানা আসরারুল হক শিবগঞ্জ হাতিমাঘ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত এবং লেখালেখির সঙ্গেও সম্পৃক্ত।

একজন শিক্ষকের প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল তাঁর লেখা বই বা প্রতিষ্ঠানে নয়; তাঁর ছাত্র ও সন্তানদের জীবন ও কর্মেও তার প্রতিফলন ঘটে। সেই অর্থে মাওলানা আব্দুল খালিকের উত্তরাধিকার তাঁর পরিবার ও অসংখ্য ছাত্র-শিষ্যের মধ্যে আজও বহমান।

পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডল

মাওলানা আব্দুল খালিকের পারিবারিক সম্পর্কও ছিল স্থানীয় শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে পরিচিত পরিবারের সঙ্গে।

তিনি জমসেদ আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য সাবেক প্রধান শিক্ষক, উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট লেখক আবদুদ দাইয়ানের ভগ্নিপতি ছিলেন। মাওলানার শ্বশুর আছদ্দর আলী পাকিস্তান আমলে চারখাই ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন।

এই পারিবারিক পরিমণ্ডল তাঁর জীবন ও সামাজিক অবস্থানকে আরও বিস্তৃত পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

স্মৃতিতে একজন মানুষ গড়ার কারিগর

যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে মাওলানা আব্দুল খালিক ছিলেন একজন পরহেজগার, বিনয়ী, জ্ঞানপিপাসু ও দায়িত্বশীল মানুষ। তিনি ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষকে নামাজ ও ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর জীবনকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করতে হলে বলা যায়—ইলম, আমল ও শিক্ষকতার সমন্বিত সাধনা। তিনি বড় কোনো পদ বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেননি; বরং জ্ঞান বিতরণ, ইমামতি, শিক্ষকতা এবং সন্তান ও শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মধ্যেই নিজের জীবনের সার্থকতা খুঁজেছেন।

ইন্তেকাল ও উত্তরাধিকার

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালে পরিবার, ছাত্র-শিষ্য, অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়।

কিন্তু একজন আলেম ও শিক্ষকের মৃত্যু তাঁর কর্মের সমাপ্তি ঘটায় না। তাঁর ছাত্রদের জ্ঞানচর্চা, সন্তানদের শিক্ষকতা এবং তাঁদের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার বিস্তারের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনকর্ম আজও প্রবাহমান।

দেউলগ্রামের ইতিহাসে মাওলানা আব্দুল খালিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাই কেবল একজন মাদ্রাসাশিক্ষক হিসেবে নয়; তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মকে ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের আলোয় গড়ে তোলার একজন নিবেদিত মানুষ।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উত্তরাধিকার সম্ভবত এই—নিজে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, তা মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন এবং নিজের সন্তানদেরও সেই জ্ঞান ও আদর্শের ধারক করে গেছেন।

বি:দ্র: স্মৃতিচারণের তথ্য-উপাত্ত  অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুদ দাইয়ান এর ফেসবুক টাইমলাইন থেকে সংগ্রহীত ও সম্পাদিত আকারে প্রকাশিত।