
আতাউর রহমান, জকিগঞ্জের বালাই হাওর থেকে ফিরে :
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব (র.)-এর ইন্তেকাল বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ঈসালে সওয়াব মাহফিল সিলেটের জকিগঞ্জে ধর্মীয় আবেগ, শৃঙ্খলা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
বুধবার (১৫ জানুয়ারি) ফুলতলী ছাহেববাড়ি সংলগ্ন বালাই হাওরে অনুষ্ঠিত এ মাহফিলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লাখো ভক্ত-আশিকানের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় হাজারো এতীমসহ মুরিদীন-মুহিব্বীনের অংশগ্রহণে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব (র.)-এর মাযার যিয়ারতের মাধ্যমে মাহফিলের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর খতমে কুরআন, খতমে বুখারী, খতমে খাজেগান ও খতমে দালাইলুল খাইরাত অনুষ্ঠিত হয়। স্মৃতিচারণ ও জীবনঘনিষ্ঠ আলোচনায় দিনব্যাপী মাহফিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল পরিবেশে অতিবাহিত হয়।
মাহফিলে মুরিদীন-মুহিব্বীনের উদ্দেশ্যে তা’লীম-তরবিয়ত প্রদান করেন আল্লামা ফুলতলী ছাহেব (র.)-এর সুযোগ্য উত্তরসূরি উস্তাযুল উলামা ওয়াল মুহাদ্দিসীন, মুরশিদে বরহক হযরত আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী বড় ছাহেব ফুলতলী। তিনি বলেন, আল্লামা ফুলতলী (র.) অসহায় মানুষের সেবার যে আগুন হৃদয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকা উচিত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও হানাফী মাজহাবের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) ও শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.)-এর কিতাব অধ্যয়নের আহ্বান জানান। ইস্তিগাছা ও ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ’ বলাকে কেন্দ্র করে বিদ্যমান বিভ্রান্তির বিষয়ে তিনি ঐতিহাসিক দলিল উপস্থাপন করেন।
বয়ানে তিনি ইয়াযীদ ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের যুলুমের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ক্ষমতা রক্ষার নামে সংঘটিত যুলুমের পরিণতি ভয়াবহ। সাঈদ ইবন যুবায়র (রা.)-এর শাহাদাত ও তাঁর দুআ কবুল হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা যেন কারো উপর যুলুম না করি এবং যুলুমের সুযোগও না দিই। নবী করীম (সা.)-এর প্রতি আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আল্লামা ফুলতলী (র.)-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য সনদের খেদমত অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি হিযবুল বাহারের ফজিলত, যিকর-আযকারে সিলসিলার অনুসরণের গুরুত্ব এবং এতীম-অনাথ ও মা-বাবার খেদমতের তাৎপর্য তুলে ধরেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাওলানা আহমদ হাসান চৌধুরী ফুলতলী, ফুলতলী কামিল মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা নজমুল হুদা খান, মাসিক পরওয়ানা সম্পাদক মাওলানা রেদওয়ান আহমদ চৌধুরী এবং জার্মানির এরফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক মাওলানা মারজান আহমদ চৌধুরীর যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত মাহফিলে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ৩৯তম বংশধর, মদীনা শরীফের প্রখ্যাত বুযুর্গ সায়্যিদ আল হাবীব আসিম আদী ইয়াহইয়া ও জেদ্দার বিশিষ্ট বুযুর্গ সায়্যিদ আল হাবীব ওমর আহমদ আল হাবাশী।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মিয়া মো. নূরুল হক, বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হযরত আল্লামা নজমুদ্দীন চৌধুরী, বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব মাওলানা শাব্বির আহমদ মোমতাজী, সিলেট সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মাহমুদুল হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শহীদুল হক প্রমুখ।
মাহফিলে বক্তব্য রাখেন মাওলানা শিহাব উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী, মুফতী মাওলানা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী, হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা কমরুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী, বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ’র সভাপতি মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী, মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা এ.কে.এম মনোওর আলী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, ইয়াকুবিয়া হিফযুল কুরআন বোর্ডের জেনারেল সেক্রেটারি হাফিয মাওলানা ফখরুদ্দীন চৌধুরী, আনজুমানে আল ইসলাহ ইউকের প্রেসিডেন্ট মাওলানা নজরুল ইসলাম, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ আলী, জালালপুর জালালিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা জ. উ. ম আব্দুল মুনঈম, ঢাকা মাহমুদা খাতুন মহিলা কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মুফতী মো. বদিউল আলম সরকার, ঢাকা মোহাম্মদপুর গাউছিয়া ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মুফতী মুহাম্মদ এজহারুল হকসহ আরও অনেকে।
এছাড়া মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন ইকড়ছই আলিম মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা ছমির উদ্দিন, বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুর রহীম, চান্দাইরপাড়া সুন্নিয়া হাফিজিয়া ফাযিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ছরওয়ারে জাহান, সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আবু জাফর নুমান, মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শামসুল ইসলাম, হলিয়ারপাড়া সিনিয়র মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. মাওলানা মঈনুল ইসলাম পারভেজসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য আলেম, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ।
সিলেট-৫ আসনের সাবেক এমপি হযরত আল্লামা হুসাম উদ্দিন চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, তালামীযে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়; এটি ইসলামের প্রহরী। ধর্মের নামে প্রতারণা ও রাজনীতির অপব্যবহার প্রতিহত করা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, বিগত ১৫ মাসে ইসলামের কোন খেদমত দেখা যায়নি। অধিকন্তু নতুন করে ৯ম শ্রেণির ইংরেজি পুস্তকে সমকামিতা সংযোজন করে শিশুদের বিপথগামী করা হচ্ছে। অনতিবিলম্বে বিপথগামী পাঠ বাতিল করতে হবে।
শেষে খতমে খাজেগান ও বিশেষ মুনাজাতের মাধ্যমে মাহফিলের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।